চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহন তথ্য নিয়ন্ত্রণের উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রসমর্থিত ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম ‘লগইঙ্ক’ বা LOGINK, যেটিকে কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য সম্ভাব্য ‘সুপার অস্ত্র’ হিসেবে দেখেছিল, এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে কার্যত পিছু হটেছে।
চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে স্থানীয় সরকারি উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছিল এই প্ল্যাটফর্ম। উদ্দেশ্য ছিল বন্দর, শুল্ক কর্তৃপক্ষ, ট্রাক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য একটি ডিজিটাল ব্যবস্থায় এনে পণ্য পরিবহনকে দ্রুত ও সহজ করা। পরে বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের সমর্থন পেয়ে এটি চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে যায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য করা হয়।
লগইঙ্কের ধারণাটি ছিল বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের তথ্যকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা। ২০১০ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ নেয় চীন। পরবর্তী সময়ে হংকংভিত্তিক একটি লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেও চুক্তি হয়। চীনা পক্ষের দাবি ছিল, এর মাধ্যমে বিশ্বের বিপুল অংশের জাহাজ চলাচলের তথ্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।

কিন্তু ২০২২ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে এই উদ্যোগের বিরোধিতা শুরু করে। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আশঙ্কা ছিল, লগইঙ্কের ব্যাপক আন্তর্জাতিক বিস্তার ঘটলে চীন বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, পণ্য, পরিবহনের পরিমাণ ও মূল্যসংক্রান্ত তথ্য চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। এমনকি বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের তথ্যও নজরদারির আওতায় আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
তবে লগইঙ্ক ঠিক কী পরিমাণ এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করত, তা প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরে দেওয়া এক বক্তব্যে লগইঙ্কের এক কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, সংস্থাটির সংবেদনশীল বাণিজ্যিক তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের ওপর ধারাবাহিক নজরদারি চালানোর সক্ষমতা নেই।
আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণে একের পর এক বাধা
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পাশাপাশি লগইঙ্কের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর ডিজিটাল তথ্য বিনিময়ের একটি প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এতে আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর সঙ্গে তাদের সহযোগিতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই পথ আর এগোয়নি।
লগইঙ্ক আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর সংগঠন আইপিসিএসএর সদস্যপদও হারিয়েছে। ২০২৪ সালে সদস্যপদের ফি দেওয়া বন্ধ করার পর প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহণ শেষ হয়। একই সময়ের কাছাকাছি লগইঙ্কের ওয়েবসাইটও অকার্যকর হয়ে যায়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পরে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় প্রকল্পটিও স্থগিত এবং কার্যত নিষ্ক্রিয়।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চীনের যে তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা ছিল, সেটিও থমকে গেছে। ২০২৪ সালের মার্চে নির্ধারিত একটি বৈঠক চীন বাতিল করে। এরপর আর কোনো বৈঠক হয়নি। জাপানও পরে লগইঙ্কের তথ্য ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারায় এবং চীনা অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বলে দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান।
ইউরোপেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। পর্তুগালের বৃহত্তম বন্দর সিনেসের সঙ্গে ২০১৭ সালে লগইঙ্কের একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। কিন্তু তা থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো ফল আসেনি। নেদারল্যান্ডসের রটারডাম বন্দরের ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে ২০১৯ সালে করা সমঝোতাও প্রাথমিক আলোচনার বাইরে এগোয়নি।
চীনের ভেতরেও আর্থিক ও আইনি সংকট
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি চীনের অভ্যন্তরেও লগইঙ্কের কার্যক্রম নিয়ে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। ঝেজিয়াংয়ের ওয়েনঝৌতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনাকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ৩৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার দাবির মোট অর্থ প্রায় ১৩ লাখ ডলার। কিছু মামলা শ্রমসংক্রান্ত বিরোধ, আবার কিছু বকেয়া ইউটিলিটি বিলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর মধ্যে চায়না মোবাইলের স্থানীয় একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তারা সেবা দেওয়ার চুক্তি নিয়ে লগইঙ্কের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে আদালত লগইঙ্ককে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। তবে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, তা নথি থেকে স্পষ্ট নয়।
লগইঙ্কের বিরুদ্ধে ভাড়া-সংক্রান্ত বিরোধের মামলাও হয়েছে। যে শিল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় ছিল, সেই এলাকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান তাদের বিরুদ্ধে সম্পত্তির ইজারা নিয়ে মামলা করে। মে মাসে এ বিষয়ে শুনানিও হয়।
ওয়েনঝৌর কার্যালয়ে নেই কর্মচাঞ্চল্য

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়েনঝৌতে লগইঙ্কের কার্যক্রমের কেন্দ্র পরিদর্শন করে সেখানে কার্যত কোনো কর্মকাণ্ডের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কার্যালয়ের আলো বন্ধ ছিল, অভ্যর্থনাকক্ষ ফাঁকা এবং কম্পিউটারের তারও খুলে নেওয়া হয়েছিল। ভবনটিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকার মতো পরিবেশ দেখা যায়।
তবে ভবনের দেয়ালে তখনও ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি স্লোগান। সেখানে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর চীনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লগইঙ্কের কার্যক্রম প্রায় থেমে গেলেও চীনের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্য অবকাঠামোয় প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর লক্ষ্য পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
লগইঙ্কের এই পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে এর আন্তর্জাতিক পিছু হটার সময়টি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের সঙ্গে মিলে যায়। ওয়াশিংটন মিত্রদেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে চীনা প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে সহযোগিতার ঝুঁকি তুলে ধরেছিল।
বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হওয়ায় বৈশ্বিক নৌপরিবহন তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে লগইঙ্কের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ থেমে যাওয়া শুধু একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের ব্যর্থতা নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য অবকাঠামো ও তথ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দীর্ঘ প্রতিযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।












