চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আগের পূর্বাভাসে সংস্থাটি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিল। অর্থাৎ পূর্বাভাস কমানো হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট। পরের ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। সেই পূর্বাভাসও আগের চেয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমানোর পেছনে জ্বালানি ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক তিনটি বড় বাধার কথা বলেছে। প্রথমটি জ্বালানি সংকট, যার কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। দ্বিতীয় বাধা দুর্বল ব্যাংক খাত। জুন শেষে মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। তৃতীয়টি দুর্বল রাজস্ব আদায়। এর সঙ্গে বিনিয়োগে ভাটা, রপ্তানির ধীরগতি আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসমে বলেছেন, ব্যাংক খাত, রাজস্ব আদায় ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার দরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক জামানত ছাড়াই প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। নিয়ম শিথিল রাখার এই নীতি আর্থিক খাতের প্রয়োজনীয় মেরামত পিছিয়ে দিচ্ছে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি। ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধানের ৪ শতাংশ সীমা তুলে দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের যুক্তি, এতে ছোট ঋণগ্রহীতারা সহজে ঋণ পাবেন।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের খবর মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য। গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরেও তা ৮ দশমিক ৬ শতাংশের আশপাশে থাকতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গত অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। কর্মসংস্থান তৈরিও প্রায় থমকে আছে, বিশেষ করে নারীরা কাজ হারিয়েছেন। এর মধ্যে স্বস্তির জায়গা প্রবাসী আয়। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা সামান্য কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। সরকার সম্প্রতি আইএমএফ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে বন্ড ছেড়ে বাজার থেকে অর্থ তোলার কথা বলেছে। এই অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস সরকারের জন্য সতর্কসংকেত। জ্বালানি আর ব্যাংক খাতের সংকট না কাটলে প্রবৃদ্ধি ফেরানো কঠিন হবে, এটাই প্রতিবেদনের মূল বার্তা। এর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আইএমএফও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস সেই ধারাকেই আরও স্পষ্ট করল।












