বহুজাতিক কোম্পানির কর ফাঁকি ও মুনাফা স্থানান্তর ঠেকাতে আন্তর্জাতিকভাবে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশগুলোর পুরোনো প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাচ্ছে। কম করের হার ও বিশেষ কর সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ টানার কৌশল এখন আগের মতো কার্যকর থাকছে না। এর পরিবর্তে অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, ব্যবসার পরিবেশ ও আইনের স্থিতিশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের অক্টোবর ২০২৬-এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের পর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে।
আইএমএফ বলছে, কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বহুজাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে খুব কম করপোরেট করহার এবং নানা ধরনের বিশেষ কর সুবিধা ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে নিজেদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হতো।
কিন্তু মুনাফা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া এবং করযোগ্য আয় কম দেখানোর প্রবণতা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক করব্যবস্থায় সংস্কার জোরদার হওয়ায় এই কৌশলের কার্যকারিতা কমছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক ন্যূনতম করব্যবস্থা চালুর ফলে শুধু কম করহার দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
ফলে দেশগুলোকে এখন কর কমানোর প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে অর্থনীতির অন্যান্য শক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। আইএমএফের ভাষায়, করপোরেট করহার কমিয়ে এক ধরনের ‘নিচের দিকে প্রতিযোগিতা’ করার বদলে দেশগুলোকে অ-করভিত্তিক সুবিধা তৈরির দিকে এগোতে হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে উন্নত সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা এবং সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ।
আইএমএফ মনে করছে, এই পরিবর্তন উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। করভিত্তিক প্রতিযোগিতা কমে গেলে দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সমতল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে যেসব দেশে অবকাঠামোর ঘাটতি বেশি, প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে বা নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা রয়েছে, তাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা আরও কঠিন হতে পারে।
এ কারণে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ বা এফডিআই আকর্ষণে শুধু কর সুবিধা দেওয়ার ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা বাড়ায়—এমন সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের কর প্রশাসনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্বচ্ছ ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় শুধু ‘কে কম কর দিচ্ছে’—এই প্রশ্নের চেয়ে ‘কে ভালো ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে পারছে’—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












