ফয়সাল আহমেদ
বাংলাদেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপ আছে, তবে এর বেশির ভাগই নির্বিষ। মানুষের জন্য বড় বিপদ মূলত কয়েকটি বিষধর সাপ: গোখরা, ক্রেইট জাতের কালাচ ও শঙ্খিনী, আর চন্দ্রবোড়া। প্রথম দুই দল প্রায়ই ঘরবাড়ির আশপাশে থাকে, চন্দ্রবোড়া থাকে ফসলের মাঠে।
কোন সাপ কেমন দেখতে, কোথায় থাকে আর কামড়ালে কী করতে হবে, তা জানা থাকলে অনেক মৃত্যু এড়ানো যায়। এই লেখায় বাংলাদেশের প্রধান বিষধর সাপের পরিচিতি, চেনার উপায় আর প্রাথমিক করণীয় তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশে কত প্রজাতির সাপ আছে
সাপের প্রজাতি গোনার হিসাব গবেষণাভেদে কিছুটা আলাদা। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপ আছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত দেশি গবেষকদের এক পর্যালোচনায় ৮৯টি প্রজাতিকে নিশ্চিত বলা হয়েছে। এর মধ্যে এক ডজনের বেশি প্রজাতি কয়েক দশক ধরে আর দেখা যায়নি।
দুই হিসাবেই বেশির ভাগ সাপ নির্বিষ। অর্থাৎ চোখের সামনে সাপ দেখলেই সেটি বিষধর, এমন ভাবার কারণ নেই। দাঁড়াশ, দুধরাজ বা ঘরগিন্নির মতো অনেক নির্বিষ সাপ মানুষের বসতির কাছেই থাকে। এরা ইঁদুর ও ব্যাঙ খেয়ে বরং উপকার করে।
বিষধর সাপগুলো মূলত দুটি পরিবারের। একটি ইলাপিডি, যার মধ্যে আছে গোখরা, রাজগোখরা, ক্রেইট আর সামুদ্রিক সাপ। অন্যটি ভাইপারিডি, যার মধ্যে আছে চন্দ্রবোড়া ও সবুজ বোড়া জাতীয় সাপ।
গোখরা: ফণা দেখে চেনা যায়
গোখরা বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত বিষধর সাপ। অনেক এলাকায় একে জাত সাপ বা জাতি সাপ নামেও ডাকা হয়। বিপদ টের পেলে এটি মাথা উঁচু করে চওড়া ফণা মেলে ধরে।
চেনার সহজ উপায় ফণার পেছনের দাগ। কোনো কোনো গোখরার ফণায় চশমার মতো জোড়া বলয় থাকে। আবার কোনোটির ফণায় থাকে একটি মাত্র গোল বলয়। শরীরের রং সাধারণত হালকা বাদামি থেকে কালচে।
গোখরা মানুষের বসতির কাছাকাছি থাকে। গোয়ালঘর, খড়ের গাদা, ইঁদুরের গর্ত আর পুরোনো দেয়ালের ফাটল এর প্রিয় জায়গা। এর বিষ মূলত স্নায়ুর ওপর কাজ করে, তাই কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
গোখরার বড় আত্মীয় রাজগোখরা বা শঙ্খচূড়। এটি দেশের বিষধর সাপের মধ্যে আকারে সবচেয়ে বড়। তবে লোকালয়ে এর দেখা কম মেলে।
কালাচ ও শঙ্খিনী: রাতের নীরব বিপদ
ক্রেইট জাতের সাপকে দেশের নানা এলাকায় কালাচ, কেউটে বা শঙ্খিনী নামে ডাকা হয়। কালাচ সাধারণত কালো বা নীলচে কালো, পিঠজুড়ে সরু সাদা ডোরা থাকে। শঙ্খিনীর শরীরে থাকে চওড়া হলুদ আর কালো ডোরা।
কালাচ মূলত রাতে চলাফেরা করে। তাই এর বেশির ভাগ কামড় হয় রাতে। বর্ষায় এই সাপ শুকনো জায়গার খোঁজে ঘরে ঢুকে পড়ে। মেঝেতে ঘুমানো মানুষ তখন কামড় খায়, অনেক সময় ঘুম থেকে জাগার আগেই।
কালাচের বিষ স্নায়ুকে অবশ করে দেয়। ধীরে ধীরে পেশি দুর্বল হয়, শেষে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তাই রাতে ঘুমের মধ্যে কিছুতে কামড়েছে মনে হলে, দাগ বা ব্যথা কম থাকলেও দেরি না করে হাসপাতালে যান।
চন্দ্রবোড়া: মাঠের সাপ
চন্দ্রবোড়ার ইংরেজি নাম রাসেলস ভাইপার। মোটা বাদামি শরীরে সারি সারি গাঢ় গোল দাগ থাকে। বিরক্ত হলে এটি জোরে হিস হিস শব্দ করে।
এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে সাপটিকে দেশে খুব বিরল মনে করা হতো। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে বিশেষ করে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এর কামড়ের ঘটনা বাড়তে থাকে। আক্রান্তদের বেশির ভাগ মাঠে কাজ করা কৃষক।
গবেষকরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে বছরজুড়ে চাষাবাদ বেড়েছে। মাঠে সারা বছর ইঁদুর থাকায় চন্দ্রবোড়ার খাবারের অভাব হয় না। পদ্মা অববাহিকা ধরে সাপটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
সবুজ বোড়া ও সামুদ্রিক সাপ
পাহাড়ি বন, চা-বাগান আর ঝরনার ধারে সবুজ রঙের কয়েক প্রজাতির বোড়া সাপ দেখা যায়। এগুলোকে পিট ভাইপার বলা হয়। এদের মাথা তিনকোনা, গায়ের রং গাছের পাতার সঙ্গে মিশে যায়। লোকালয় থেকে দূরে থাকায় এদের কামড়ের ঘটনা তুলনামূলক কম।
বঙ্গোপসাগর ও উপকূলে কয়েক প্রজাতির সামুদ্রিক সাপও আছে। এরা সাধারণত পানিতেই থাকে, ডাঙায় খুব একটা ওঠে না। জেলেরা অনেক সময় জালে এদের পান, তাই জাল থেকে মাছ ছাড়ানোর সময় সাবধান থাকা দরকার।
সব সবুজ সাপই বিষধর নয়। লাউডগা সাপ দেখতে সবুজ ও সরু হলেও এর মাথা লম্বাটে, বোড়ার মতো তিনকোনা নয়।
সাপে কামড়ালে কী করবেন
সাপে কামড়ালে প্রথম কাজ রোগীকে শান্ত রাখা। আক্রান্ত হাত বা পা যতটা সম্ভব নাড়াচাড়া না করে স্থির রাখুন। রোগীকে হাঁটিয়ে বা দৌড়িয়ে না নিয়ে বহন করে নিন।
দেরি না করে নিকটতম সরকারি হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিন। সাপের বিষের একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা অ্যান্টিভেনম। কোথায় তা পাবেন, নিচে আলাদা করে বলা হলো।
কিছু কাজ একেবারেই করবেন না। কামড়ের জায়গা কাটবেন না, মুখ দিয়ে বিষ চুষবেন না। শক্ত করে বাঁধন দেবেন না, এতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে ক্ষতি বাড়ে। বরফ, লতাপাতা, ঝাড়ফুঁক বা ওঝার চিকিৎসায় সময় নষ্ট করবেন না।
সম্ভব হলে দূর থেকে সাপের চেহারা মনে রাখুন বা ছবি তুলুন। তবে সাপ ধরতে বা মারতে গিয়ে নতুন বিপদ ডেকে আনবেন না। চিকিৎসার সিদ্ধান্ত চিকিৎসকই নেবেন।
বাংলাদেশে সাপের কামড়ের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির জাতীয় জরিপ ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়। এতে ২০২১-২২ সালের তথ্য ধরা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষকে সাপে কামড়ায়। বছরে মারা যান প্রায় ৭ হাজার ৫১১ জন।
এর মানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জন মানুষ সাপের কামড়ে মারা যান। বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে গ্রামে, বর্ষায় এর হার বাড়ে। দেরিতে হাসপাতালে যাওয়া আর ওঝার কাছে সময় নষ্ট করাকে বিশেষজ্ঞরা মৃত্যুর বড় কারণ মনে করেন।
অ্যান্টিভেনম কোথায় পাবেন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম পাঠায়। তবে বিতরণ করা অ্যান্টিভেনমের একটি অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়, আর সব উপজেলায় সব সময় মজুত থাকে না।
তাই বর্ষার আগেই নিজের এলাকার কোন হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম আছে, তা জেনে রাখুন। প্রয়োজনে সরাসরি জেলা সদর হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। অ্যান্টিভেনম শুধু হাসপাতালে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকই দেবেন।
দেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশের সাপের বিষ দিয়ে নিজস্ব অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যে ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভেনম রিসার্চ সেন্টার চালু হয়েছে।
এক নজরে কোন সাপ কোথায় থাকে
গোখরা: বসতবাড়ি, গোয়ালঘর, খড়ের গাদা আর ইঁদুরের গর্তের আশপাশে। ফণা তুলে সতর্ক করে।
কালাচ: ঘরের ভেতরে ও আশপাশে, বিশেষ করে বর্ষায়। রাতে সক্রিয়, ঘুমন্ত মানুষকে কামড়ায়।
শঙ্খিনী: গ্রামাঞ্চলে, কালাচের মতোই রাতে বেশি সক্রিয়। হলুদ-কালো ডোরা দেখে চেনা যায়।
চন্দ্রবোড়া: ফসলের মাঠ, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চল ও পদ্মা অববাহিকা। মাঠে কাজ করা কৃষকেরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
সবুজ বোড়া: পাহাড়ি বন, চা-বাগান ও ঝরনার ধারে, গাছের ডালে।
সামুদ্রিক সাপ: বঙ্গোপসাগর ও উপকূলের পানিতে।
সাপের কামড় এড়াতে যা করবেন
মেঝেতে না ঘুমিয়ে খাট বা চৌকিতে ঘুমান, মশারি টানিয়ে বিছানার চারপাশ গুঁজে দিন। শ্রীলঙ্কার দুটি গ্রামে মাটি থেকে উঁচুতে ঘুমানো আর সচেতনতার পর কালাচের কামড় কমে আসার তথ্য মিলেছে।
রাতে চলাফেরার সময় টর্চ ব্যবহার করুন। মাঠে কাজের সময় বুট বা মোটা জুতা পরুন, খালি হাতে খড় বা ঝোপ সরাবেন না। ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখুন, ইঁদুর কমলে সাপ আসার কারণও কমে।
সাধারণ প্রশ্ন
বাংলাদেশের বিষাক্ত সাপ কোনগুলো?
গোখরা, রাজগোখরা, কালাচ ও শঙ্খিনী জাতের ক্রেইট, চন্দ্রবোড়া, সবুজ বোড়া আর সামুদ্রিক সাপ বিষধর। এর মধ্যে লোকালয়ে বেশি বিপদ ঘটায় গোখরা, কালাচ ও চন্দ্রবোড়া।
বাংলাদেশে কত প্রজাতির সাপ আছে?
বিভিন্ন হিসাবে দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপ আছে। এর বেশির ভাগই নির্বিষ।
সাপের বিষ কোথায় থাকে?
সাপের বিষ থাকে মাথার দুই পাশের বিষগ্রন্থিতে। কামড়ের সময় বিষদাঁতের মধ্য দিয়ে তা শরীরে ঢোকে।
জাত সাপ কোনটি?
গ্রামবাংলায় সাধারণত ফণাধারী গোখরাকে জাত সাপ বলা হয়। এটি বিষধর, তাই কামড়ালে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬












