আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের প্রান্তে ছোট একটি বাজারে এত সামুদ্রিক খাবার মিলবে, তা সহজে কল্পনা করা যায় না। কিন্তু ঘানার উত্তরের সীমান্ত শহর পাগায় চিত্রটা ভিন্ন। এখানে ব্যবসায়ী আদজোয়া আল হাসান পশ্চিম আফ্রিকার নানা প্রান্ত থেকে শুকনো মাছ জোগাড় করেন। ঘানার উপকূলীয় বন্দর তাকোরাদি থেকে সরবরাহ কমে গেলে তিনি ও তাঁর মতো বাজারের ক্ষমতাধর নারী ব্যবসায়ীরা ট্রাক ভাড়া করে চলে যান বুরকিনা ফাসোর রাজধানী উগাডুগুতে। সেখানে যে মাছ কেনা হয়, তার উৎস হতে পারে টোগো, বেনিন কিংবা নাইজেরিয়ার উপকূল।
আফ্রিকার ভেতরের বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের মধ্যে খুব কম বাণিজ্য করে—এই অভিযোগ বহু পুরোনো। সরকারি হিসাবে মহাদেশের মোট বাণিজ্যের মাত্র সামান্য অংশই অভ্যন্তরীণ। উপনিবেশিক যুগের উত্তরাধিকার হিসেবে আফ্রিকার রপ্তানি বিদেশমুখী হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে। এই বাস্তবতা বদলাতে মহাদেশজুড়ে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয়েছে কয়েক বছর আগে। লক্ষ্য ছিল খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষিপণ্যের আন্তঃআফ্রিকান বাণিজ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি করা।
গোপন বাণিজ্যের বাস্তব চিত্র
কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই লক্ষ্য আংশিকভাবে একটি ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পরিসংখ্যানে আফ্রিকার ভেতরের খাদ্য বাণিজ্যের বিশাল অংশই ধরা পড়ে না। শুধু পশ্চিম আফ্রিকাতেই প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সীমান্ত পেরিয়ে কেনাবেচা হয়, যা সরকারি হিসাবের কয়েক গুণ বেশি। সড়কপথে পণ্য চলাচলই এর প্রধান কারণ, যেখানে সীমান্তে নথিভুক্তির প্রক্রিয়া প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। পশুপালকেরা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক সীমান্ত পথ এড়িয়ে গবাদিপশু বিক্রি করেন, ফলে বাণিজ্যের বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

বাজারের আকার ও বিস্তৃতি
এই অনানুষ্ঠানিক প্রবাহগুলো যোগ করলে দেখা যায়, পশ্চিম আফ্রিকার কাঁচা খাদ্য রপ্তানির বড় অংশই মহাদেশের ভেতরে হয়, যা ইউরোপীয় অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সঙ্গে তুলনীয়। শুধু খাদ্য নয়, শিল্পপণ্য ও বস্ত্রও এই অঘোষিত বাণিজ্যের অংশ। গবেষণা দেখিয়েছে, এই লেনদেনের বেশির ভাগই ছোট নয়, বরং বড় ট্রাকভিত্তিক লজিস্টিক ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়। এমনকি পাগার টমেটো বিক্রেতারাও দূরপাল্লার জন্য একাধিক ট্রাক ভাড়া করেন।
খাদ্যনিরাপত্তায় সংযুক্ত বাজারের গুরুত্ব
আরও সমন্বিত বাজার খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করতে পারে। সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে অতিরিক্ত গবাদিপশু থাকে, আর উপকূলীয় দেশগুলোর কাছে থাকে কাসাভা ও ইয়ামের মতো মূলজাত ফসলের উদ্বৃত্ত। আঞ্চলিক বাণিজ্য সহজ হলে ঘাটতি ও মূল্যঝাঁকুনি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব।
সুরক্ষাবাদের বাড়বাড়ন্ত ও ঝুঁকি
তবু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক সরকার জাতীয় খাদ্য সার্বভৌমত্বের নামে সুরক্ষাবাদের পথে হাঁটছে। কিছু দেশ স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য করছে, রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করছে। এর ফলে প্রতিবেশী দেশে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হচ্ছে। কোথাও কোথাও চাল, ভুট্টার মতো পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর।
অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ঘোষণার পরও অনেক দেশ মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার বাস্তবায়নে তেমন তাড়াহুড়া দেখাচ্ছে না। নীতিনির্ধারকেরা এখনও রপ্তানি মানেই বিদেশি বাজার ভাবছেন। আবার কিছু ক্ষমতাবান গোষ্ঠী আঞ্চলিক অসামঞ্জস্য থেকে লাভবান হওয়ায় পরিবর্তনে অনীহা দেখাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, আফ্রিকার বাণিজ্য যতটা ছোট বলে ধরা হয়, আসলে তা নয়। সঠিক নীতি ও সহযোগিতা পেলে এই বাণিজ্য আরও অনেক বড় হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















