০৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
কিশোরগঞ্জে গরুবাহী পিকআপ উল্টে নিহত ১, আহত অন্তত ১২ যশোরে বিয়ের বাস খাদে, আহত অন্তত ১২ জন গাজীপুরে শ্রমিক–পুলিশ সংঘর্ষ, অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল কেমন আছেন?’— দাভোসে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজকে জিজ্ঞেস করলেন ট্রাম্প আমাকে ক্ষেপালে আপনার হাফপ্যান্ট খুলে যাবে, কারণ আমরা শেখ হাসিনার হাফপ্যান্ট খুলে দিয়েছিলাম: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আইসিসির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ বাদ এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তিতে বাধা শেখ হাসিনার সঙ্গে তিশার ছবি জাদুঘরে রাখার প্রস্তাব, শাওনের কটাক্ষে তোলপাড় শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতি বাড়ল, সূচকের উত্থানে ফিরল বিনিয়োগকারীদের আস্থা আইসিসির প্রত্যাখ্যান, বিশ্বকাপ থেকে বাদ বাংলাদেশ

১,৩০০ কোটি টাকার জিকে সেচ পুনর্বাসন প্রকল্পে নতুন প্রাণ পাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষি

সরকার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠজলভিত্তিক সেচব্যবস্থা গঙ্গা–কপোতাক্ষ বা জিকে সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন ও জরুরি সংস্কারে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করাই মূল লক্ষ্য।

প্রকল্পের সার্বিক কাঠামো
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। পুরো অর্থায়ন সরকারই দিচ্ছে। বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলবে।

সেচ সুবিধা ও খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ হলে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। এর ফলে ফসলের নিবিড়তা বাড়বে এবং প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ৯ লাখ ৮৩ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জিকে ব্যবস্থার অবক্ষয় ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য
গত এক দশকে পলি জমে যাওয়া, পুরোনো অবকাঠামো এবং পানি পরিবহনের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় জিকে সেচব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে এই সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে সেচসেবা সচল রাখা, ফসলের ফলন বাড়ানো এবং কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

পৃষ্ঠজলের ব্যবহার ও ভূগর্ভস্থ পানির সুরক্ষা
প্রকল্পের একটি বড় উদ্দেশ্য হলো পদ্মা নদীর পৃষ্ঠজল বেশি করে ব্যবহার করা। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প শেষ হলে বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ৩ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত উন্নত হতে পারে। এর সুফল কৃষির পাশাপাশি গৃহস্থালি পানি সরবরাহ এবং বিএমডিএ, বিএডিসি ও এলজিইডির ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রমেও পাওয়া যাবে।

২০ বছরে ৯ ঘূর্ণিঝড়: ২৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষত নিয়ে ধুঁকছে উপকূল

খাল, পাম্প ও অবকাঠামো সংস্কার
এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৯৬০ কিলোমিটারের বেশি খাল পুনঃখনন ও সংস্কার করা হবে। এর মধ্যে প্রধান খাল, শাখা খাল, তৃতীয় স্তরের খাল এবং নিষ্কাশন খাল অন্তর্ভুক্ত। পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য দুইটি বড় পাম্প পুনঃস্থাপন করা হবে, প্রতিটির সক্ষমতা এক হাজার কিউসেক। পাশাপাশি নতুন পাম্পহাউস ও অতিরিক্ত পাঁচটি সহায়ক পাম্প বসানো হবে।

এ ছাড়া আউটলেট, সাইফন, একুয়াডাক্ট, সেতু, কালভার্ট এবং বিভিন্ন পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোসহ মোট ৬৬১টি সেচ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জিকে প্রকল্পের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রও পুনর্বাসন করা হবে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান বাস্তবতা
জিকে সেচ প্রকল্পটি বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে বড় আধুনিক পৃষ্ঠজল সেচব্যবস্থা। ব্রিটিশ আমলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানির সংকট মোকাবিলায় এর ধারণা আসে। ১৯৫০-এর দশকে পরিকল্পনা গ্রহণের পর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হয় এবং ষাটের দশকে সেচ কার্যক্রম শুরু হয়।

একসময় প্রায় দুই লাখ হেক্টরের কাছাকাছি এলাকা এই প্রকল্পের আওতায় থাকলেও নগরায়ণ, অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ফলে কার্যকর সেচ এলাকা কমে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খালগুলোর বেহাল অবস্থার কারণে সেচ সুবিধা আরও সীমিত হয়ে পড়ে।

পুনরুজ্জীবনে কৃষি ও মানুষের জীবন
কর্তৃপক্ষের আশা, খাল ও পাম্প ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার হলে সেচ এলাকার পরিমাণ আবার বাড়বে। এই অঞ্চলে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বসবাস করে, যাদের বড় একটি অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। নির্ভরযোগ্য সেচব্যবস্থা চালু হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জিকে সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন উদ্যোগ দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

কিশোরগঞ্জে গরুবাহী পিকআপ উল্টে নিহত ১, আহত অন্তত ১২

১,৩০০ কোটি টাকার জিকে সেচ পুনর্বাসন প্রকল্পে নতুন প্রাণ পাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষি

০৭:১৮:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

সরকার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠজলভিত্তিক সেচব্যবস্থা গঙ্গা–কপোতাক্ষ বা জিকে সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন ও জরুরি সংস্কারে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করাই মূল লক্ষ্য।

প্রকল্পের সার্বিক কাঠামো
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। পুরো অর্থায়ন সরকারই দিচ্ছে। বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলবে।

সেচ সুবিধা ও খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ হলে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। এর ফলে ফসলের নিবিড়তা বাড়বে এবং প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ৯ লাখ ৮৩ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জিকে ব্যবস্থার অবক্ষয় ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য
গত এক দশকে পলি জমে যাওয়া, পুরোনো অবকাঠামো এবং পানি পরিবহনের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় জিকে সেচব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে এই সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে সেচসেবা সচল রাখা, ফসলের ফলন বাড়ানো এবং কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

পৃষ্ঠজলের ব্যবহার ও ভূগর্ভস্থ পানির সুরক্ষা
প্রকল্পের একটি বড় উদ্দেশ্য হলো পদ্মা নদীর পৃষ্ঠজল বেশি করে ব্যবহার করা। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প শেষ হলে বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ৩ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত উন্নত হতে পারে। এর সুফল কৃষির পাশাপাশি গৃহস্থালি পানি সরবরাহ এবং বিএমডিএ, বিএডিসি ও এলজিইডির ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রমেও পাওয়া যাবে।

২০ বছরে ৯ ঘূর্ণিঝড়: ২৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষত নিয়ে ধুঁকছে উপকূল

খাল, পাম্প ও অবকাঠামো সংস্কার
এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৯৬০ কিলোমিটারের বেশি খাল পুনঃখনন ও সংস্কার করা হবে। এর মধ্যে প্রধান খাল, শাখা খাল, তৃতীয় স্তরের খাল এবং নিষ্কাশন খাল অন্তর্ভুক্ত। পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য দুইটি বড় পাম্প পুনঃস্থাপন করা হবে, প্রতিটির সক্ষমতা এক হাজার কিউসেক। পাশাপাশি নতুন পাম্পহাউস ও অতিরিক্ত পাঁচটি সহায়ক পাম্প বসানো হবে।

এ ছাড়া আউটলেট, সাইফন, একুয়াডাক্ট, সেতু, কালভার্ট এবং বিভিন্ন পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোসহ মোট ৬৬১টি সেচ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জিকে প্রকল্পের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রও পুনর্বাসন করা হবে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান বাস্তবতা
জিকে সেচ প্রকল্পটি বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে বড় আধুনিক পৃষ্ঠজল সেচব্যবস্থা। ব্রিটিশ আমলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানির সংকট মোকাবিলায় এর ধারণা আসে। ১৯৫০-এর দশকে পরিকল্পনা গ্রহণের পর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হয় এবং ষাটের দশকে সেচ কার্যক্রম শুরু হয়।

একসময় প্রায় দুই লাখ হেক্টরের কাছাকাছি এলাকা এই প্রকল্পের আওতায় থাকলেও নগরায়ণ, অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ফলে কার্যকর সেচ এলাকা কমে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খালগুলোর বেহাল অবস্থার কারণে সেচ সুবিধা আরও সীমিত হয়ে পড়ে।

পুনরুজ্জীবনে কৃষি ও মানুষের জীবন
কর্তৃপক্ষের আশা, খাল ও পাম্প ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার হলে সেচ এলাকার পরিমাণ আবার বাড়বে। এই অঞ্চলে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বসবাস করে, যাদের বড় একটি অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। নির্ভরযোগ্য সেচব্যবস্থা চালু হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জিকে সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন উদ্যোগ দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।