দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত মিললেও বাস্তবতা এখনো কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা এবং বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সর্বশেষ অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো গভীরভাবে রয়ে গেছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা
ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। আগের মাসের তুলনায় এই হার আরও বেশি। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ। চালের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও মাছ, দুধ ও ডিমসহ প্রোটিনজাত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে। একই সময়ে অখাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি।
এর বিপরীতে মজুরি মূল্যস্ফীতি প্রায় স্থবির থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান আরও বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ভোগব্যয় কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিক চাহিদা ও উৎপাদন প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমাবদ্ধতা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত কমছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের দ্বন্দ্বময় চিত্র
ব্যাংকিং খাতের তথ্য অর্থনীতির অনিশ্চয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ মানুষ সঞ্চয় করলেও সেই অর্থ উৎপাদন ও বিনিয়োগে যথাযথভাবে প্রবাহিত হচ্ছে না।
এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ২৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এতে সামগ্রিক ঋণপ্রবাহ কাগজে বাড়লেও বাস্তবে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতি ও বাজেট চাপে সরকারকে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে, যার ফলে সুদহার উঁচু থাকছে। এতে উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এবং নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে।
উৎপাদনে স্বস্তি, কিন্তু পুনরুদ্ধার অসম্পূর্ণ
সব চাপের মধ্যেও উৎপাদন খাতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশে ওঠায় নির্মাণ ও উৎপাদন কার্যক্রমে গতি ফেরার ইঙ্গিত মিলছে। কৃষি খাতও আগের সংকোচন কাটিয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে।
তবে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এখনো অসম্পূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অগ্রগতি টেকসই করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, আর্থিক খাতে সংস্কার এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি
রাজস্ব খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখা গেছে। আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর—সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এই ঘাটতি সরকারকে আরও বেশি অভ্যন্তরীণ ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সুদ ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।
বৈদেশিক খাতে স্বস্তির ইঙ্গিত
বৈদেশিক খাতে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে ডিসেম্বর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক লেনদেনেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
তবে রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্যের অভাব দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পোশাক খাত এখনো রপ্তানি আয়ের প্রধান ভরসা হয়ে থাকায় অন্যান্য খাতে স্থবিরতা বৈদেশিক আয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ
জিইডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ জোরদার, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতা দীর্ঘ সময়ের জন্য অর্থনীতির গতি মন্থর করে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















