মাঘী সপ্তমী উপলক্ষে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় শুরু হয়েছে প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দয়াময়ী মেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও রোববার ভোরে উপজেলার সুতাবাড়িয়া গ্রামের দয়াময়ী মন্দির প্রাঙ্গণে কালী পূজা ও শিব পূজার মধ্য দিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই মেলা স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মিলনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে আছে।
ভক্তি ও উৎসবে মুখর মেলা প্রাঙ্গণ
ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি ও নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সারাদিন ধরে মেলা প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে মানুষের পদচারণায়। হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জা ও বাড়তি জনসমাগমে মেলার রূপ আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

বাণিজ্য ও বিনোদনের সমাহার
এবারের মেলায় শিশুদের জন্য রঙিন খেলনার নানা দোকান বসেছে। পাশাপাশি গ্রামীণ কারিগরদের হাতে তৈরি বুনন শিল্পের সামগ্রী, দৈনন্দিন গৃহস্থালির জিনিসপত্র, মাটির বাসন, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন ও খাবারের দোকান দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। সকাল থেকেই এসব দোকানে ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে, যা মেলার প্রাণচাঞ্চল্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বাস, মানত ও মানুষের মিলন
মানত পূরণ ও দেবতার কৃপালাভের আশায় দূরদূরান্ত থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দয়াময়ী মন্দিরে সমবেত হন। এই মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং এ অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক। একই সঙ্গে এটি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য আনন্দ, সৌহার্দ্য ও মিলনের এক বিশেষ উপলক্ষ।

নদীভাঙনে সংকটে আয়োজন
চলতি বছর নদীভাঙনের কারণে মেলার স্থান সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মেলার প্রধান আঙিনার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হওয়ায় সীমিত পরিসরে আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে অনেক ভক্ত ও দর্শনার্থীকে বাড়তি ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও চ্যালেঞ্জ
সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে শতাব্দীপ্রাচীন এই মেলা আজও তার স্বকীয়তা ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দেশ ও বিদেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরা এখানে এসে দৃষ্টির আনন্দের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। গভীর রাত পর্যন্ত দোকানগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা অব্যাহত থাকে বলে আয়োজক সূত্র জানিয়েছে।
তবে মন্দির সংস্কার ও মেলার পরিসর বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি প্রশাসনিক ও আর্থিক সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন আয়োজক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
দয়াময়ী মেলা একদিকে দেবতার আরাধনার সাধনা, অন্যদিকে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের আনন্দ ও মিলনের ক্ষেত্র। ধর্মীয় আচার, মানবিক মূল্যবোধ ও লোকজ সংস্কৃতির সম্মিলনে এই মেলা আজও মানুষের জীবনে এক অনন্য ও চিরায়ত উৎসব হিসেবে টিকে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















