আকাশে ছুটে চলা বিমানের পেছনে পড়ে থাকা সাদা রেখা অনেকের চোখে নান্দনিক দৃশ্য। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দৃষ্টিনন্দন দাগই নীরবে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়িয়ে তুলছে। বিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত জলীয় বাষ্প, ধোঁয়া ও কণার মিশ্রণে তৈরি এই মেঘের মতো রেখাকে বলা হয় কনট্রেইল। দীর্ঘ সময় আকাশে টিকে থাকলে এগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
কনট্রেইল কীভাবে তৈরি হয়
উচ্চতায় উড়ার সময় বিমানের গরম জলীয় বাষ্প খুব ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। তখন সেই বাষ্প ধোঁয়ার কণাকে ঘিরে ঘনীভূত হয়ে বরফকণায় পরিণত হয়। আকাশে সোজা রেখার মতো যে সাদা মেঘ দেখা যায়, সেটিই কনট্রেইল। কিছু এলাকায় এগুলো পাতলা মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

কেন কনট্রেইল উষ্ণতা বাড়ায়
এই কৃত্রিম মেঘ সূর্যের কিছু আলো প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দিলেও একই সঙ্গে পৃথিবীর তাপ আটকে রাখে। ফলে ভূপৃষ্ঠ থেকে নির্গত তাপ মহাকাশে বের হতে পারে না। গবেষকদের মতে, বিমান খাত থেকে সৃষ্ট উষ্ণতার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী এই কনট্রেইল, যা অনেক সময় জেট জ্বালানি পোড়ানোর প্রভাবকেও ছাড়িয়ে যায়।
জ্বালানির চেয়েও ভয়ংকর প্রভাব
বিমান জ্বালানি পোড়ালে যে কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হয়, তা শত শত বছর ধরে বায়ুমণ্ডলে থেকে ধীরে ধীরে উষ্ণতা বাড়ায়। গবেষক রজার তেওহ বলছেন, এই প্রভাব অনেকটা দীর্ঘস্থায়ী রোগের মতো। অন্যদিকে কনট্রেইলের প্রভাব তীব্র জ্বরের মতো, স্বল্প সময়ে খুব শক্তিশালী উষ্ণতা তৈরি করে। বিশ বছরের হিসাবে কনট্রেইল থেকে সৃষ্ট উষ্ণতা কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে, যদিও দীর্ঘ মেয়াদে কার্বনের প্রভাব বেশি।
সব জায়গায় কি কনট্রেইল সমান
সব বিমানের পেছনে দেখা যাওয়া দাগ উষ্ণতা বাড়ায় না। ঠান্ডা অঞ্চলে, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উচ্চ অক্ষাংশে কনট্রেইল বেশি স্থায়ী হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো উপক্রান্তীয় অঞ্চলে তুলনামূলক কম দেখা যায়। সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার আকাশে কনট্রেইল কম থাকার এটিই একটি কারণ।\
তবু উপেক্ষার সুযোগ নেই
বিশ্বব্যাপী মোট উড়ানের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ থেকে স্থায়ী কনট্রেইল তৈরি হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে মাত্র তিন শতাংশ উড়ানই মোট উষ্ণতার আশি শতাংশের জন্য দায়ী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উচ্চতায় উড়া বড় বিমানের উড়ানেই এই ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।
সিঙ্গাপুরের উদ্যোগ
এই বাস্তবতায় সিঙ্গাপুর আঞ্চলিকভাবে কনট্রেইল নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে। নতুন বিমান আবহাওয়া কর্মসূচির আওতায় এখানকার আকাশের ভিন্ন পরিস্থিতিতে কনট্রেইল কীভাবে তৈরি হয়, তা জানার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষায়, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ বিষয়ে তথ্য ও গবেষণা এখনো খুবই সীমিত।
সমাধানের পথ কী
বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিমানের পথ বা উচ্চতা সামান্য বদলে দেওয়া। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবহার করে কনট্রেইল তৈরির ঝুঁকিপূর্ণ স্তর এড়িয়ে উড়ান পরিচালনা করা গেলে বড় মাত্রায় উষ্ণতা কমানো সম্ভব। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু উড়ান সামান্য ঘুরিয়ে নিলেই কনট্রেইল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে, অথচ জ্বালানি খরচ বেড়েছে খুব সামান্য।
ভবিষ্যতের জ্বালানি
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার করলে ধোঁয়ার কণা কম তৈরি হয়, ফলে কনট্রেইলও কম হতে পারে। তবে এই জ্বালানির সরবরাহ এখনো সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, পথ পরিবর্তন করা এখনই সম্ভব, বড় কোনো নতুন অবকাঠামো ছাড়াই। আর নতুন জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু বছর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















