ইউএনবি
সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে হরিণ শিকারের ফাঁদে আটকে পড়া একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে সম্প্রতি উদ্ধার করার ঘটনা আবারও নজর কেড়েছে ব্যাপক চোরাশিকার ও প্রাণঘাতী ফাঁদের ভয়াবহ বিস্তারের দিকে। এই প্রবণতা সুন্দরবনের শীর্ষ শিকারি বাঘের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
গত ৪ জানুয়ারি চাঁদপাই রেঞ্জে হরিণ ধরার ফাঁদে আটকে পড়া একটি আহত বাঘকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। বর্তমানে বাঘটি খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে বিভিন্ন বয়সী বাঘের চলাচল বাড়ায় বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আশার সঞ্চার হলেও সেই আশার ওপর ঘন ছায়া ফেলছে আরেকটি বড় সংকট—বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের দ্রুত হ্রাস।
গত ছয় বছরে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বেড়েছে, যা বন পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বন বিভাগের ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ রয়েছে। এটি ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি।

২০২৪ সালের বাঘ জরিপের ফল প্রকাশ করতে গিয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সুন্দরবনে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে বর্তমানে বাঘের ঘনত্ব ২ দশমিক ৬৪।
তবে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার রাতে ব্যাপক হারে হরিণ শিকার সুন্দরবনের শীর্ষ শিকারির খাদ্যভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাঘের খাদ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে চিত্রা হরিণ থেকে, বাকি ২০ শতাংশ আসে বন্য শুকর, বনবিড়াল ও বানর থেকে।
নিয়মিত ও ব্যাপক হরিণ শিকারের ফলে বনাঞ্চলে শিকারের প্রাণীর প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রবণতা চলতে থাকলে বাঘ সংরক্ষণে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা আবারও হুমকির মুখে পড়বে।
খুলনার বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে বাঘের চলাচল বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বাঘের খাদ্যের বড় অংশ হরিণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় শিকার কমে গেলে বাঘের আচরণেও তার প্রভাব পড়ে।
গভীর অরণ্যে নীরব ফাঁদ

চোরাশিকারিরা এখন বনভূমির গভীরে পাতার তৈরি ফাঁদ ও চেতনানাশক ট্যাবলেট ব্যবহার করে হরিণ শিকার করছে। এর ফলে চাঁদপাই, শরণখোলা, সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের সপ্তাহে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাংস প্রয়োজন। খাদ্য সংকট দেখা দিলে বাঘ নদী ও খাল পেরিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা মানুষ ও বাঘের মধ্যে সংঘাত বাড়িয়ে দেয়।
সুন্দরবন বিষয়ক প্রকাশনা সুন্দরবন-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালের এক জরিপে বনাঞ্চলে চিত্রা হরিণের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৬০৪টি। সংরক্ষণকর্মীদের মতে, বাঘের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে টেকসইভাবে ধারণ করার জন্য এই সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় ইতোমধ্যেই কম।
হাজার হাজার ফাঁদ জব্দ
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, সমস্যার মাত্রা ভয়াবহ। গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগই বিভিন্ন ধরনের ৬১ হাজার ৪০০টির বেশি ফাঁদ উদ্ধার করেছে। পশ্চিম বন বিভাগে গত দুই বছরে উদ্ধার করা হয়েছে ৩ হাজার ১৪৮ ফুট দৈর্ঘ্যের ফাঁদ।

একই সময়ে চোরাশিকারিদের কাছ থেকে ১ হাজার ১৪৮ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ৭২টি মামলা দায়ের করে ১৯২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, পাথরঘাটা উপজেলার বিশ্বাসপাড়া, চারদুয়ানি, গাংপাড়া ও শরণখোলা এলাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি ফাঁদ উদ্ধার হয়েছে। একইভাবে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের কালাবাগী ও বনিয়াখালী এলাকাতেও বিপুল পরিমাণ ফাঁদ পাওয়া গেছে।
স্বীকৃত হুমকি, অমীমাংসিত সংকট
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, পাতার ফাঁদ শুধু হরিণের জন্য নয়, বাঘের জন্যও মারাত্মক হুমকি। তিনি জানান, বিষয়টি টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৮–২০২৭-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
তার মতে, বননির্ভর বহু মানুষের জন্য হরিণ শিকার এখন দ্বিতীয় আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার রাতে স্থানীয় বাজারে হরিণের মাংসের চাহিদা বাড়ে, ফলে চোরাশিকারও বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও বলেন, বনাঞ্চলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হরিণ আর নেই। একই সঙ্গে ফাঁদে পড়ে বাঘের অঙ্গহানি , প্রাণহানির ঝুঁকিও বাড়ছে।

বাঘের সংখ্যা বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো শিকারযোগ্য প্রাণী সংরক্ষণ। পর্যাপ্ত হরিণের সংখ্যা নিশ্চিত করা না গেলে সুন্দরবনের এই নাজুক সাফল্য দ্রুতই আরেকটি সংরক্ষণ ব্যর্থতার গল্পে পরিণত হতে পারে, যেখানে বনে বাঘ থাকবে বেশি, কিন্তু টিকে থাকার মতো খাদ্য থাকবে না।

Sarakhon Report 



















