ভারতকে একসঙ্গে আত্মবিশ্বাসী ও দ্বিধাগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার যে দ্বৈততা, তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিফলন মিলেছে সাহিত্যপত্র গ্রান্টার নতুন ভারত সংখ্যা জুড়ে। ক্ষমতার ভাষা, ধর্মের অভিনয়, রাজনীতির দৃশ্যায়ন আর সাহিত্যের আত্মসমালোচনা—সব মিলিয়ে এই সংখ্যা যেন সমসাময়িক ভারতেরই একটি আয়না।
গ্রান্টার প্রচ্ছদে ধরা পড়েছে এক প্রতীকী মুহূর্ত। গেরুয়া পোশাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমুদ্রের নিচে প্রার্থনার ভঙ্গিতে। কচ্ছ উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলে নৌবাহিনীর ডুবুরিদের নিরাপত্তায় সেই দৃশ্য। বাইরে থেকে তা যোগসাধনার ছবি, ভেতরে ক্যামেরা, হেলমেট আর পরিকল্পিত আয়োজন। ধর্ম এখানে বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং অভিনয়। রাজনীতি হয়ে উঠেছে দৃশ্যমান উৎসব।
এই দৃশ্যের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পানির নিচে প্রাচীন দ্বারকার ধ্বংসাবশেষের ছবি। আবিষ্কার বলে প্রচারিত সেই ছবিগুলো পরে কৃত্রিমভাবে তৈরি বলে প্রমাণিত হয়। একসময় সম্মানিত প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থা এখন গবেষণার চেয়ে ইচ্ছাপূরণের পথে হাঁটছে—এমন মন্তব্য উঠে আসে প্রতিবেদনে। পুরাণ অনুসন্ধানকে প্রত্নতত্ত্বের বৈধতা দেওয়া হলেও, পুরাণ যে ইতিহাস হয়ে গেছে, তার প্রমাণ নেই।

বাস্তবতা আর কল্পনার এই টানাপোড়েনেই দাঁড়িয়ে আছে ভারতের আজকের গল্প। গ্রান্টার প্রতিবেদনে উঠে আসে, এই দেশের বাস্তবতা কল্পকাহিনির চেয়েও জটিল। তাই হয়তো উপন্যাস সেই গতিতে বাস্তবতাকে ধরতে পারছে না। একদিকে অতীতে বাস করা ভারত, অন্যদিকে নিজেকে ভবিষ্যৎ ভেবে নেওয়া ভারত। এই দ্বন্দ্বই সভ্যতার গভীর সংকেত।
সাহিত্য ও জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ইতিহাসবিদ সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম মনে করেন, ভারতে সাহিত্য, সংগীত বা শিল্প—সবকিছুকেই জাতীয়তাবাদের চশমা দিয়ে দেখার এক প্রবণতা রয়েছে। অন্যদিকে গ্রান্টার সম্পাদক বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কথাসাহিত্যে এক ধরনের স্থবিরতা এনেছে। মতভেদ থাকলেও এই বিতর্কই আজকের সাহিত্য আলোচনার সীমানা টেনে দেয়।
তবে এই সংখ্যায় থাকা কথাসাহিত্য সেই স্থবিরতার ধারণাকে পুরোপুরি মেনে নেয় না। বিভিন্ন ভাষার শক্তিশালী লেখকের গল্প প্রমাণ করে, শিল্পের প্রাণ এখনো জাগ্রত। ভারতের ভাষার বৈচিত্র্য, অসমিয়া থেকে উর্দু পর্যন্ত শব্দের সৌন্দর্য, অনুবাদের মাধ্যমে এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় যাত্রা—সবকিছুই এই সংখ্যার বড় অর্জন। একসময় ইংরেজিতে লেখা সাহিত্য আর দেশীয় ভাষার লেখার মাঝে যে কৃত্রিম দূরত্ব ছিল, তা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।
পাশ্চাত্যের স্বীকৃতি আর একমাত্র মাপকাঠি নয়। তা এখন বাণিজ্যিক গুরুত্ব রাখলেও সাহিত্যিক আত্মবিশ্বাসের একমাত্র উৎস নয়। গ্রান্টা এই পরিবর্তনকে স্বীকার করেই অনুবাদকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কিছু গল্প এককভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, সংবেদনশীলতা আর সূক্ষ্ম রসিকতায় পাঠককে স্পর্শ করে।

ভারতীয় কথাসাহিত্যের চিরাচরিত বিষয়—জাতপাত, পরিচয়, কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা, যৌন রাজনীতি, পিতৃতন্ত্র—এখনো রয়েছে। তবে আগের প্রজন্মের অভিযোগের সুর কমে এসেছে। গল্পগুলো ইতিহাসকে সমতল করে ফেলার বিরোধিতা করে, সময়ের জটিলতা ধরে রাখতে চায়।
সব মিলিয়ে গ্রান্টা তার অংশগুলোর যোগফলের চেয়েও কম মনে হতে পারে। কিন্তু সেটাই ভারতের মতো এক দেশের যথার্থ প্রতিচ্ছবি। অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের সেই বিখ্যাত কথাই মনে পড়ে—ভারত সম্পর্কে যা বলা যায়, তার উল্টো কথাও সত্য। গ্রান্টা এই দ্বৈততাকেই ধরেছে তার রূপ আর বিষয়বস্তুর ভেতর দিয়ে।
আধুনিকতা এখনো ভারতের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। প্রযুক্তি আর দারিদ্র্যের পাশাপাশি অবস্থান আজও অমোচনীয়। অতীত আর ভবিষ্যৎ বর্তমানকে ঘিরে নিরন্তর সংঘর্ষে লিপ্ত। অনেক সময় যা বলা হয় না, সেটাই সবচেয়ে বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। গ্রান্টার এই ভারত সংখ্যা সেই নীরবতার ভাষাও পাঠককে শোনাতে চায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















