০৮:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় গম চালান, বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে রাষ্ট্রদূতের সফর ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন করলে ভোটের পরেও ব্যবস্থা নেবে ইসি গাজীপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে নারী ও দুই শিশুর মৃত্যু শেখ হাসিনা থাকলে অন্তত একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলত: মির্জা ফখরুল সাদ্দামের জামিন: এবার স্ত্রী ও সন্তানের নীরব কবর দেখবে! পাকিস্তান–ভারত ম্যাচ বয়কটের ইঙ্গিত, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে কড়া অবস্থানে পিসিবি বাংলাদেশ প্রশাসন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে নতুন মুখ, সভাপতি কানিজ মৌলা ও মহাসচিব বাবুল মিয়া সমালোচনার ঝড়ে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগ ভারতের মুসলমানদের কাছে সংস্কার আজ কোনো বিভ্রান্তি নয়, ন্যায়ের লড়াইয়েরই অংশ ইইউ চুক্তি কেন ভারতীয় কৃষকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি লাভজনক

সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা অপরিহার্য

একটি সুস্থ গণতন্ত্র পূর্ণ ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে নয়, বরং শক্তিশালী ও পারস্পরিক সম্মানজনক বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, স্বায়ত্তশাসন, পর্যাপ্ত সম্পদ ও যথাযথ স্বীকৃতি পেলে বিরোধীদলীয় নেতা সেই গণতান্ত্রিক সংলাপের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারেন।

সিঙ্গাপুরের গণতন্ত্রের জন্য এটি ছিল এক দুঃখজনক দিন, যখন ওয়ার্কার্স পার্টি প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের আহ্বান সত্ত্বেও প্রীতম সিংয়ের পরিবর্তে নতুন কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মনোনয়ন দিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রীতম সিংয়ের কাছ থেকে পদটি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা ও অবস্থানকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তার দল বিকল্প কাউকে না দেওয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যে, এই প্রতিষ্ঠানটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কতটা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। সিঙ্গাপুরের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিষ্ঠান একটি অপরিহার্য স্তম্ভ।

বিরোধীদলীয় নেতা কেবল প্রতীকী কোনো পদ নন। তিনি সংসদে বৃহত্তম বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক প্রধান, যাঁর দায়িত্ব সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমত ও বিরোধী কণ্ঠস্বরকে প্রতিনিধিত্ব করা। ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের শাসনব্যবস্থায়, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য ও নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাহী ক্ষমতার একটি কার্যকর প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরে এই পদটি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত এবং প্রধান বিরোধী দল চাইলে তা প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। ফলে এই ভূমিকাটি প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়। এই অবস্থার পরিবর্তনে সংস্কার জরুরি, যা কেবল বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিষ্ঠানকেই নয়, বরং পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করবে।

ভূমিকার গুরুত্ব

ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং শাসনব্যবস্থার একটি প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। বিরোধিতার উদ্দেশ্য অন্ধ বিরোধিতা নয়, বরং গঠনমূলক পর্যালোচনা ও উপেক্ষিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরা। সংসদে বিকল্প মতামতের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন বিরোধীদলীয় নেতা।

সিঙ্গাপুরের প্রেক্ষাপটে এই ভূমিকার গুরুত্ব আরও বেশি। স্বাধীনতার পর থেকে পিপলস অ্যাকশন পার্টি সংসদে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। বহু বছর ধরে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব সীমিত থাকায় বিরোধীদলীয় নেতাকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে—সংসদীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি, তথ্যের সীমিত প্রবেশাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব।

একটি পরিণত গণতন্ত্রে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব সংসদে বক্তব্য দেওয়া বা প্রথম জবাব দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলকে নেতৃত্ব দিতে হয়, সরকারের নীতি ও বাজেটের সমালোচনা করতে হয়, বিকল্প আইন প্রস্তাব করতে হয় এবং যাঁরা নিজেদের প্রতিনিধিত্বহীন মনে করেন, তাঁদের উদ্বেগ তুলে ধরতে হয়। এমনকি সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তুতিও তাঁর দায়িত্বের অংশ।

PM Lee calls on Opposition to be 'upfront' about stance on Singapore's  reserves and take ideas to ballot box - TODAY

নিয়মকানুনের অস্পষ্টতা

২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং প্রীতম সিংকে সিঙ্গাপুরের প্রথম বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০২৫ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং আবার তাঁকে ওই পদে নিয়োগ দিলেও আদালতের দণ্ড ও সংসদীয় প্রস্তাবের পর তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরও ওয়ার্কার্স পার্টি বিকল্প কাউকে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা টেকসই নয় এবং দায়িত্বশীল বিরোধী দলের প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সরকার যে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিষ্ঠানকে গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, সাম্প্রতিক বিতর্ক তা স্পষ্ট করেছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করা যায় কীভাবে।

বর্তমানে বিরোধীদলীয় নেতার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ভাতা, দপ্তর ও কর্মী সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে আর্থিক চাপ ছাড়াই দায়িত্ব পালন সম্ভব হয়। তবে যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো অন্যান্য ওয়েস্টমিনস্টার গণতন্ত্রের তুলনায় সিঙ্গাপুরে এই পদের আইনি কাঠামো অনেকটাই শিথিল ও অনিশ্চিত। এখানে নিয়োগের জন্য কোনো নির্দিষ্ট যোগ্যতা, মেয়াদসীমা বা অপসারণের সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নেই। এমনকি পদটি ফাঁকা রেখে দেওয়ার সুযোগও রয়েছে, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

যদিও বিরোধীদলীয় নেতা সাধারণ সংসদ সদস্যের দ্বিগুণ ভাতা ও কিছু বাড়তি প্রশাসনিক সহায়তা পান, তবুও এই সম্পদ মন্ত্রীদের প্রাপ্ত সুবিধার তুলনায় অনেক কম। পূর্ণাঙ্গ গবেষণা দল, নীতি বিশ্লেষণের বাজেট বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তাঁর নেই। ফলে জটিল অর্থনৈতিক বা সামাজিক নীতি পর্যালোচনায় তিনি পিছিয়ে পড়েন।

Canada's Trudeau 'has lost control' says opposition leader after deputy PM  quits | AFP

মন্ত্রীদের মতো নিয়মিত নীতি-সংক্রান্ত ব্রিফিং বা অভ্যন্তরীণ আলোচনার তথ্য বিরোধীদলীয় নেতার কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। প্রয়োজনীয় নথি বা শ্বেতপত্র অনেক সময় অনুরোধ না করলে পাওয়া যায় না। এই বৈষম্য বিরোধী দলের বিতর্কের মানকে দুর্বল করে।

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকলে বিরোধীদলীয় নেতার আন্তরিক প্রচেষ্টাও অনেক সময় প্রতীকী বলে মনে হয়। দীর্ঘমেয়াদে এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে হতাশা বাড়ে।

সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে কিছু সুবিধা থাকলেও সংবিধানে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকার স্পষ্ট স্বীকৃতি নেই। ফলে সংসদীয় রীতিনীতির পরিবর্তন বা রাজনৈতিক সুবিধার ওপর এই পদটি সহজেই প্রভাবিত হতে পারে।

অন্যান্য দেশে চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে বিরোধীদলীয় নেতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি রয়েছে, নির্দিষ্ট বেতন, দপ্তর, কর্মী, নিয়োগ ও অপসারণের নিয়ম, সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত ব্রিফিং এবং সীমিত পরিসরে গোপন নথিতে প্রবেশাধিকার রয়েছে। সংসদে নির্দিষ্ট বিরোধী দলীয় দিবসও রয়েছে, যেখানে বিরোধীরা আলোচনার সূচি নির্ধারণ করে।

কানাডায় বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রায় সরকারের উপপ্রধানের মতো মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর জন্য পর্যাপ্ত বাজেট, গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের সীমিত সুযোগ এবং সরকারের কাঠামোর অনুরূপ ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে।

এগুলো পরিণত গণতন্ত্র হলেও সিঙ্গাপুরেও ধীরে ধীরে বিরোধীদলীয় নেতার ক্ষমতায়ন জরুরি। এতে ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হবে না, বরং আরও শক্তিশালী হবে।

ভূমিকা শক্তিশালী করার পথ

Separation of powers

সংসদে আইন প্রণয়ন বা কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতার নিয়োগ ও অপসারণের জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। কোন শর্তে বিরোধী দল এই পদ পাওয়ার যোগ্য হবে, মেয়াদসীমা থাকবে কি না, অসদাচরণের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব স্পষ্ট হওয়া দরকার।

সরকারের উচিত বিরোধীদলীয় নেতার দপ্তরের জন্য আরও অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা এবং একটি নিবেদিত গবেষণা দল গঠন করা, যাতে তিনি তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারেন।

শ্রেণিবদ্ধ নয় এমন সরকারি প্রতিবেদন, নীতির খসড়া ও মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগপত্র নিয়মিতভাবে তাঁর কাছে পৌঁছানো উচিত। এতে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং আগাম প্রস্তুত অবস্থায় নীতি বিতর্কে অংশ নিতে পারবেন।

যুক্তরাজ্যের আদলে সংসদে একটি বিরোধী দলীয় দিবস নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেখানে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হবে এবং বিরোধী দলের শাসনক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হবে।

আনুষ্ঠানিক ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হলে নীতি উন্নয়ন আরও গভীর হবে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও শীর্ষ সংসদীয় নেতাদের মধ্যে নিয়মিত কাঠামোবদ্ধ সংলাপ সংঘাত কমিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা, সংকট মোকাবিলা ও নৈতিক শাসন নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

Building a democratic society: A role for many helping hands - Academia | SG

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা শক্তিশালী করা কেবল ন্যায্যতা বা রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন নয়, এটি সিঙ্গাপুরের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিষয়। শক্তিশালী বিরোধী দল নীতিগত বিচ্যুতি কমায়, বৈচিত্র্যময় ধারণা উৎসাহিত করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একমুখী চিন্তা প্রতিরোধ করে। এতে নাগরিকদের আস্থা বাড়ে এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগে গণতন্ত্র আরও অভিযোজিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।

কেউ কেউ আশঙ্কা করতে পারেন, এতে সংসদ অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠবে বা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হবে। কিন্তু অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে, গঠনমূলক বিরোধিতা বরং সিদ্ধান্তের মান উন্নত করে। খরচ নিয়েও আপত্তি থাকতে পারে, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার বীমা।

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অপরিহার্য। সরকারকে দুর্বল করা নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই এর লক্ষ্য।

সিঙ্গাপুর যত বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল সমাজে পরিণত হচ্ছে, তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ততটাই বিকশিত হতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চিন্তা ও সংস্কারের সুযোগ দিয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা স্পষ্ট করা, পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করা এবং দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে সিঙ্গাপুর সুশাসন, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রতি নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে পারে।

যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, বিরোধী দলকে বাধা নয়, বরং সবার জন্য ভালো ভবিষ্যৎ নির্মাণের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত।

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা শক্তিশালী করে সিঙ্গাপুর কেবল গণতন্ত্রই নয়, সামাজিক সংহতি ও নাগরিক সমাজকেও আরও দৃঢ় করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় গম চালান, বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে রাষ্ট্রদূতের সফর

সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা অপরিহার্য

০৬:৩৯:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

একটি সুস্থ গণতন্ত্র পূর্ণ ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে নয়, বরং শক্তিশালী ও পারস্পরিক সম্মানজনক বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, স্বায়ত্তশাসন, পর্যাপ্ত সম্পদ ও যথাযথ স্বীকৃতি পেলে বিরোধীদলীয় নেতা সেই গণতান্ত্রিক সংলাপের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারেন।

সিঙ্গাপুরের গণতন্ত্রের জন্য এটি ছিল এক দুঃখজনক দিন, যখন ওয়ার্কার্স পার্টি প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের আহ্বান সত্ত্বেও প্রীতম সিংয়ের পরিবর্তে নতুন কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মনোনয়ন দিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রীতম সিংয়ের কাছ থেকে পদটি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা ও অবস্থানকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তার দল বিকল্প কাউকে না দেওয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যে, এই প্রতিষ্ঠানটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কতটা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। সিঙ্গাপুরের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিষ্ঠান একটি অপরিহার্য স্তম্ভ।

বিরোধীদলীয় নেতা কেবল প্রতীকী কোনো পদ নন। তিনি সংসদে বৃহত্তম বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক প্রধান, যাঁর দায়িত্ব সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমত ও বিরোধী কণ্ঠস্বরকে প্রতিনিধিত্ব করা। ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের শাসনব্যবস্থায়, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য ও নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাহী ক্ষমতার একটি কার্যকর প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরে এই পদটি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত এবং প্রধান বিরোধী দল চাইলে তা প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। ফলে এই ভূমিকাটি প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়। এই অবস্থার পরিবর্তনে সংস্কার জরুরি, যা কেবল বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিষ্ঠানকেই নয়, বরং পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করবে।

ভূমিকার গুরুত্ব

ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং শাসনব্যবস্থার একটি প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। বিরোধিতার উদ্দেশ্য অন্ধ বিরোধিতা নয়, বরং গঠনমূলক পর্যালোচনা ও উপেক্ষিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরা। সংসদে বিকল্প মতামতের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন বিরোধীদলীয় নেতা।

সিঙ্গাপুরের প্রেক্ষাপটে এই ভূমিকার গুরুত্ব আরও বেশি। স্বাধীনতার পর থেকে পিপলস অ্যাকশন পার্টি সংসদে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। বহু বছর ধরে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব সীমিত থাকায় বিরোধীদলীয় নেতাকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে—সংসদীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি, তথ্যের সীমিত প্রবেশাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব।

একটি পরিণত গণতন্ত্রে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব সংসদে বক্তব্য দেওয়া বা প্রথম জবাব দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলকে নেতৃত্ব দিতে হয়, সরকারের নীতি ও বাজেটের সমালোচনা করতে হয়, বিকল্প আইন প্রস্তাব করতে হয় এবং যাঁরা নিজেদের প্রতিনিধিত্বহীন মনে করেন, তাঁদের উদ্বেগ তুলে ধরতে হয়। এমনকি সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তুতিও তাঁর দায়িত্বের অংশ।

PM Lee calls on Opposition to be 'upfront' about stance on Singapore's  reserves and take ideas to ballot box - TODAY

নিয়মকানুনের অস্পষ্টতা

২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং প্রীতম সিংকে সিঙ্গাপুরের প্রথম বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০২৫ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং আবার তাঁকে ওই পদে নিয়োগ দিলেও আদালতের দণ্ড ও সংসদীয় প্রস্তাবের পর তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরও ওয়ার্কার্স পার্টি বিকল্প কাউকে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা টেকসই নয় এবং দায়িত্বশীল বিরোধী দলের প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সরকার যে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিষ্ঠানকে গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, সাম্প্রতিক বিতর্ক তা স্পষ্ট করেছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করা যায় কীভাবে।

বর্তমানে বিরোধীদলীয় নেতার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ভাতা, দপ্তর ও কর্মী সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে আর্থিক চাপ ছাড়াই দায়িত্ব পালন সম্ভব হয়। তবে যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো অন্যান্য ওয়েস্টমিনস্টার গণতন্ত্রের তুলনায় সিঙ্গাপুরে এই পদের আইনি কাঠামো অনেকটাই শিথিল ও অনিশ্চিত। এখানে নিয়োগের জন্য কোনো নির্দিষ্ট যোগ্যতা, মেয়াদসীমা বা অপসারণের সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নেই। এমনকি পদটি ফাঁকা রেখে দেওয়ার সুযোগও রয়েছে, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

যদিও বিরোধীদলীয় নেতা সাধারণ সংসদ সদস্যের দ্বিগুণ ভাতা ও কিছু বাড়তি প্রশাসনিক সহায়তা পান, তবুও এই সম্পদ মন্ত্রীদের প্রাপ্ত সুবিধার তুলনায় অনেক কম। পূর্ণাঙ্গ গবেষণা দল, নীতি বিশ্লেষণের বাজেট বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তাঁর নেই। ফলে জটিল অর্থনৈতিক বা সামাজিক নীতি পর্যালোচনায় তিনি পিছিয়ে পড়েন।

Canada's Trudeau 'has lost control' says opposition leader after deputy PM  quits | AFP

মন্ত্রীদের মতো নিয়মিত নীতি-সংক্রান্ত ব্রিফিং বা অভ্যন্তরীণ আলোচনার তথ্য বিরোধীদলীয় নেতার কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। প্রয়োজনীয় নথি বা শ্বেতপত্র অনেক সময় অনুরোধ না করলে পাওয়া যায় না। এই বৈষম্য বিরোধী দলের বিতর্কের মানকে দুর্বল করে।

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকলে বিরোধীদলীয় নেতার আন্তরিক প্রচেষ্টাও অনেক সময় প্রতীকী বলে মনে হয়। দীর্ঘমেয়াদে এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে হতাশা বাড়ে।

সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে কিছু সুবিধা থাকলেও সংবিধানে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকার স্পষ্ট স্বীকৃতি নেই। ফলে সংসদীয় রীতিনীতির পরিবর্তন বা রাজনৈতিক সুবিধার ওপর এই পদটি সহজেই প্রভাবিত হতে পারে।

অন্যান্য দেশে চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে বিরোধীদলীয় নেতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি রয়েছে, নির্দিষ্ট বেতন, দপ্তর, কর্মী, নিয়োগ ও অপসারণের নিয়ম, সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত ব্রিফিং এবং সীমিত পরিসরে গোপন নথিতে প্রবেশাধিকার রয়েছে। সংসদে নির্দিষ্ট বিরোধী দলীয় দিবসও রয়েছে, যেখানে বিরোধীরা আলোচনার সূচি নির্ধারণ করে।

কানাডায় বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রায় সরকারের উপপ্রধানের মতো মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর জন্য পর্যাপ্ত বাজেট, গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের সীমিত সুযোগ এবং সরকারের কাঠামোর অনুরূপ ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে।

এগুলো পরিণত গণতন্ত্র হলেও সিঙ্গাপুরেও ধীরে ধীরে বিরোধীদলীয় নেতার ক্ষমতায়ন জরুরি। এতে ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হবে না, বরং আরও শক্তিশালী হবে।

ভূমিকা শক্তিশালী করার পথ

Separation of powers

সংসদে আইন প্রণয়ন বা কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতার নিয়োগ ও অপসারণের জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। কোন শর্তে বিরোধী দল এই পদ পাওয়ার যোগ্য হবে, মেয়াদসীমা থাকবে কি না, অসদাচরণের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব স্পষ্ট হওয়া দরকার।

সরকারের উচিত বিরোধীদলীয় নেতার দপ্তরের জন্য আরও অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা এবং একটি নিবেদিত গবেষণা দল গঠন করা, যাতে তিনি তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারেন।

শ্রেণিবদ্ধ নয় এমন সরকারি প্রতিবেদন, নীতির খসড়া ও মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগপত্র নিয়মিতভাবে তাঁর কাছে পৌঁছানো উচিত। এতে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং আগাম প্রস্তুত অবস্থায় নীতি বিতর্কে অংশ নিতে পারবেন।

যুক্তরাজ্যের আদলে সংসদে একটি বিরোধী দলীয় দিবস নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেখানে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হবে এবং বিরোধী দলের শাসনক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হবে।

আনুষ্ঠানিক ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হলে নীতি উন্নয়ন আরও গভীর হবে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও শীর্ষ সংসদীয় নেতাদের মধ্যে নিয়মিত কাঠামোবদ্ধ সংলাপ সংঘাত কমিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা, সংকট মোকাবিলা ও নৈতিক শাসন নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

Building a democratic society: A role for many helping hands - Academia | SG

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা শক্তিশালী করা কেবল ন্যায্যতা বা রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন নয়, এটি সিঙ্গাপুরের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিষয়। শক্তিশালী বিরোধী দল নীতিগত বিচ্যুতি কমায়, বৈচিত্র্যময় ধারণা উৎসাহিত করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একমুখী চিন্তা প্রতিরোধ করে। এতে নাগরিকদের আস্থা বাড়ে এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগে গণতন্ত্র আরও অভিযোজিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।

কেউ কেউ আশঙ্কা করতে পারেন, এতে সংসদ অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠবে বা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হবে। কিন্তু অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে, গঠনমূলক বিরোধিতা বরং সিদ্ধান্তের মান উন্নত করে। খরচ নিয়েও আপত্তি থাকতে পারে, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার বীমা।

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অপরিহার্য। সরকারকে দুর্বল করা নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই এর লক্ষ্য।

সিঙ্গাপুর যত বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল সমাজে পরিণত হচ্ছে, তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ততটাই বিকশিত হতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চিন্তা ও সংস্কারের সুযোগ দিয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা স্পষ্ট করা, পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করা এবং দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে সিঙ্গাপুর সুশাসন, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রতি নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে পারে।

যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, বিরোধী দলকে বাধা নয়, বরং সবার জন্য ভালো ভবিষ্যৎ নির্মাণের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত।

বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা শক্তিশালী করে সিঙ্গাপুর কেবল গণতন্ত্রই নয়, সামাজিক সংহতি ও নাগরিক সমাজকেও আরও দৃঢ় করতে পারে।