ভারতের কৃষিনীতিতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বরাবরই স্পর্শকাতর বিষয়। বিশেষ করে কৃষি খাতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কৃষি অন্তর্ভুক্ত চুক্তি ভারতের কৃষকদের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং সম্ভাবনাময়।
কৃষি কেন বাণিজ্য আলোচনায় সবচেয়ে বড় বাধা
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে কৃষি খাতই সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত বিষয়। একই কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য বড় চুক্তিতেও কৃষিকে অনেকটা বাইরে রাখার চিন্তা রয়েছে। এর মূল কারণ জীবিকাগত চাপ। ভারতে কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বিপুল। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে খামারের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের কম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নেও তা সীমিত, সেখানে ভারতে কৃষি খামার ও কৃষক পরিবারের সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছেছে। এত বড় জনগোষ্ঠীর স্বার্থে বিদেশি কৃষিপণ্যের সহজ প্রবেশ নিয়ে সরকারগুলো বরাবরই সতর্ক।
![]()
ইউরোপেও কৃষক অসন্তোষের নজির
কৃষি পণ্য আমদানির ভয় শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি করলেও ইউরোপীয় সংসদে তা নিয়ে তীব্র আপত্তি ওঠে। ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে কৃষকরা রাস্তায় নেমে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই চুক্তির ফলে গরুর মাংস, চিনি ও পোলট্রি পণ্যের আমদানি বেড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ইউরোপীয় আদালতে পাঠানো হয়। এতে স্পষ্ট, কৃষি নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপের ভেতরেও গভীর।
ভর্তুকি প্রশ্নে বাস্তব চিত্র
কৃষি ভর্তুকি নিয়ে তুলনামূলক চিত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা ও বাজারদরের মাধ্যমে বড় অঙ্কের সুবিধা দেয়। সেখানে ভারতের চিত্র উল্টো। সেচ, বিদ্যুৎ, সার ও ঋণের মতো খাতে ভারতের ভর্তুকি বড় হলেও বাজারে নানা নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বিধিনিষেধের কারণে কৃষকরা ন্যায্য দাম পান না। ফলে কার্যত বাজারদরের মাধ্যমে ভারতীয় কৃষকের ওপর পরোক্ষ কর বসে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দমনমূলক দামই ভারতের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ।
![]()
চীনের সঙ্গে ভারতের পার্থক্য
এখানে চীনের উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। চীন বিপুল অঙ্কে কৃষকদের সহায়তা দেয় এবং বাজারদরের মাধ্যমেও কৃষকদের লাভ নিশ্চিত করে। ফলে সেখানে কৃষি খাতে মোটের ওপর ইতিবাচক সহায়তার চিত্র দেখা যায়। ভারতের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো, যেখানে ভর্তুকি থাকা সত্ত্বেও বাজারদরের চাপে কৃষকের আয় কমে যায়।
ইইউ কেন তুলনামূলক নিরাপদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষিপণ্য ভারতের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিযোগিতামূলক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা, সয়াবিন, তুলা বা ইথানল ভারতের কৃষকদের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে ইউরোপ থেকে মূলত উচ্চমূল্যের পনির, মদ, অলিভ তেল বা বিশেষ পণ্য আসতে পারে, যা দেশীয় কৃষিকে বড়ভাবে আঘাত করে না।

রপ্তানিতে ভারতের লাভের সুযোগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কৃষি অন্তর্ভুক্ত চুক্তি হলে ভারতের জন্য রপ্তানির নতুন দরজা খুলতে পারে। সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, কফি, চা, ফল, সবজি, মসলা ও চালের মতো পণ্যে ইউরোপীয় বাজারে ভারতের চাহিদা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পণ্যগুলোর রপ্তানি থেকে ভারত উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক আয় করেছে। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমলে এই রপ্তানি আরও বাড়তে পারে, যা সরাসরি কৃষকের আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শেষ কথা
সব দিক বিবেচনায় অর্থনীতিবিদদের ধারণা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কৃষি অন্তর্ভুক্ত চুক্তি ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং বেশি সম্ভাবনাময়। প্রয়োজনে সুরক্ষামূলক শুল্ক আরোপ করে আমদানি চাপ সামাল দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তিকে ভারতীয় কৃষকের জন্য বেশি সহনীয় বলেই মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















