আমরা এটি লিখছি কোনো বিমূর্ত পর্যবেক্ষক হিসেবে নয়, বরং এমন মানুষ হিসেবে, যারা ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে আজীবন কাজ করেছেন এবং একই সঙ্গে ভারতীয় মুসলমান—যাঁরা মুসলমানদের উদ্বেগ, নীরবতা ও সহনশীলতার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। এর আগে কখনো ভারতে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন এত নিরবচ্ছিন্ন সন্দেহের মুখে পড়েনি। আজ মুসলমান হয়ে থাকা মানে কেবল নাগরিকত্বের সাধারণ দায়ভার বহন করা নয়; বরং প্রতিনিয়ত নিজেকে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হওয়া, আনুগত্য প্রমাণ করা, দেশপ্রেম দেখানো—যেন নাগরিকত্ব কোনো সাংবিধানিক অধিকার নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ এক বিশেষ সুবিধা।
এই বোঝা কল্পনাপ্রসূত নয়। প্রতিদিন সাধারণ মুসলমানদের জীবনে এর প্রকাশ ঘটছে, বিশেষত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে, যেখানে শাসনব্যবস্থায় একটি স্পষ্ট আদর্শিক ধার দেখা যাচ্ছে। নির্বিচার পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, পাহারাদারি সহিংসতা, বেছে বেছে উচ্ছেদ অভিযান, আর আইনি প্রক্রিয়ার আগেই গণমাধ্যমে সন্দেহ আর ইঙ্গিত ছড়িয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে এক শীতল ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্বই যেন অস্থায়ী বলে মনে হচ্ছে।
তবু, শুনতে যত অস্বস্তিকরই হোক, নিপীড়ন—যত অন্যায়ই হোক—মুসলমানদের জনজীবনের একমাত্র সংগঠক নীতি হয়ে উঠতে পারে না। কেবল বৈরিতার জবাব দিয়ে কোনো সম্প্রদায় টিকে থাকতে পারে না, আর শুধু নিজের ক্ষত গণনা করেই মর্যাদা অর্জন সম্ভব নয়। নৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য আরও কঠিন কিছু দরকার: নিজের ভেতরে তাকানোর সাহস, অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা নিয়ে সৎভাবে কথা বলার ক্ষমতা, এবং রাষ্ট্র বা প্রতিপক্ষের অনুমতির অপেক্ষা না করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া।
এটি অন্যায় ভুলে যাওয়ার আহ্বান নয়। কিংবা গ্রহণযোগ্যতার আশায় সমালোচনার ধার নরম করার অনুরোধও নয়। এটি আসলে নিজের ক্ষমতা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার ঘোষণা। সংস্কার মানে আত্মসমর্পণ নয়; সংস্কার মানে আত্মসম্মান।
ভারতে মুসলমানদের সংস্কারের ধারণাটি রাজনৈতিক দখলের মাধ্যমে গভীরভাবে বিকৃত হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী বয়ান বেছে বেছে তিন তালাক, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রতিনিধিত্ব, কিংবা মুসলমানদের মধ্যে বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের মতো বিষয় সামনে আনে—সমতার জন্য নয়, বরং মুসলমানদের অনন্যভাবে পশ্চাৎপদ হিসেবে তুলে ধরে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ফলে সংস্কার হয়ে ওঠে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এক ‘সভ্যতা শেখানোর’ প্রকল্প, যার মোড়কে থাকে জাতীয়তাবাদের ভাষা।

এর নীরব লক্ষ্য স্পষ্ট: ইসলামকে শাসনে বেঁধে ফেলা এবং মুসলমানদের গৃহপালিত করা। ২০১৯ সালে তিন তালাককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত এই দ্বন্দ্বকে স্পষ্টভাবে ধরেছিল। তাৎক্ষণিক তিন তালাক যে নারীদের প্রতি অন্যায়, সে বিষয়ে বিশেষ দ্বিমত ছিল না। কিন্তু এক তীব্র মেরুকৃত পরিবেশে একটি দেওয়ানি বিষয়কে ফৌজদারি অপরাধে পরিণত করে রাষ্ট্র নিশ্চিত করেছিল যে এই সংস্কার ন্যায়ের চেয়ে শাস্তি হিসেবেই বেশি দেখা হবে। প্রগতিশীল মুসলমান কণ্ঠগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ে—তাদের বাধ্য করা হয় এমন একটি আইন সমর্থন করতে, যা তাদের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, অথবা একটি অগ্রহণযোগ্য প্রথাকে রক্ষা করার অভিযোগ বহন করতে। গভীর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সুযোগ তখনই হারিয়ে যায়।
এর পর থেকে এক ধরনের পক্ষাঘাতগ্রস্ত নীরবতা নেমে এসেছে। মুসলমান রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, এমনকি শাসকগোষ্ঠীর সমালোচক বহু ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠও বলেন, এখন অভ্যন্তরীণ বিতর্কের সময় নয়। তাদের যুক্তি, মুসলমান সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করলে বৈরী শক্তি তা কাজে লাগিয়ে আরও কলঙ্ক আরোপ করবে। এই ভয় ভিত্তিহীন নয়। আমরা দেখেছি, কীভাবে অর্ধসত্য ফুলে-ফেঁপে গিয়ে স্টেরিওটাইপে পরিণত হয়, আর বিচ্ছিন্ন কিছু চর্চা গোটা সভ্যতার বিরুদ্ধে অভিযোগে রূপ নেয়। তবু নীরবতারও নিজস্ব বিপদ আছে। সংস্কার যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়, তা হারিয়ে যায় না; বরং শত্রুভাবাপন্ন আদালত, জবরদস্তিমূলক আইন আর সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
অতএব, দুটি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া জরুরি। প্রথমত, সমকালীন মুসলমান সংস্কার উনিশ শতকের ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের নস্টালজিক পুনরাবৃত্তি হতে পারে না। আজ মুসলমানরা যে চ্যালেঞ্জের মুখে, তার জন্য জীবিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ব্যবহারিক সমাধান দরকার। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় মুসলমানরা একক কোনো গোষ্ঠী নন। যে কোনো অর্থবহ সংস্কার কর্মসূচিকে তাদের বহুত্ব স্বীকার করতে হবে এবং একই সঙ্গে কিছু যৌথ উদ্বেগ চিহ্নিত করতে হবে।
এমন তিনটি উদ্বেগ রয়েছে, যেগুলোর প্রতি অবিলম্বে ও সম্মিলিত মনোযোগ প্রয়োজন।
প্রথমটি শিক্ষা। সাচার কমিটির বহু বছর পরও মুসলমানদের শিক্ষাগত প্রান্তিকতা প্রকট। প্রাথমিক স্তরে উচ্চ ভর্তির হার থাকলেও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ভয়াবহ—যার মূল কারণ দারিদ্র্য, অনিরাপদ জীবিকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব। অভিভাবকেরা শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করেন বলে নয়, বরং টিকে থাকার তাগিদে সন্তানদের স্কুল থেকে তুলে নিতে বাধ্য হন। এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যে সাংবিধানিক গণতন্ত্র সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেয়, সে পুরো একটি সম্প্রদায়কে কাঠামোগত বঞ্চনার হাতে ছেড়ে দিতে পারে না। তবে সম্প্রদায়কেও এগিয়ে আসতে হবে। একটি বাস্তব ও শক্তিশালী উদ্যোগ হতে পারে—স্থানীয় মসজিদগুলোকে নতুনভাবে কল্পনা করা, কমিউনিটি শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে। সন্ধ্যার স্কুল, সহায়ক পাঠদান, দক্ষতা প্রশিক্ষণের জায়গা হিসেবে—ধর্ম নির্বিশেষে সব শিশুর জন্য উন্মুক্ত। এমন উদ্যোগ শুধু শ্রমজীবী মুসলমান পরিবারগুলোকেই সহায়তা করবে না, বরং একটি গভীর সত্যও প্রতিষ্ঠা করবে: মুসলমান প্রতিষ্ঠানগুলো জাতির নাগরিক জীবনের অংশ, প্রান্ত নয়। এর মধ্যে মাদ্রাসায় আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করাও অন্তর্ভুক্ত। ‘দ্বীনি শিক্ষা’ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইংরেজি, গণিত বা বিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা অপরাধের শামিল।
এ থেকেই আসে দ্বিতীয় উদ্বেগ: মুসলমানদের দৃশ্যমানতা। গত তিন দশকে জনপরিসরে মুসলমানদের উপস্থিতি সীমিত হয়ে গেছে কয়েকটি কঠোর প্রতীকে—মিনার, দাড়ি, হিজাব। এই চিত্রগুলো বারবার ব্যবহার করে বিচ্ছিন্নতা, অযৌক্তিকতা ও আধুনিকতার বিরোধিতা বোঝানো হয়। যখন মসজিদ শিক্ষাকেন্দ্র, কল্যাণ ও পাড়াভিত্তিক সেবার স্থান হিসেবে কাজ করে—যখন তারা বৃহত্তর সমাজের জন্য দরজা খুলে দেয়—তখন এই ক্যারিকেচারগুলো নীরবে ভেঙে পড়ে। তখন ইসলামের এক প্রাচীন নৈতিক বোধ আবার প্রতিষ্ঠিত হয়: মানবতার সেবা ঈশ্বরভক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্রটি হলো মুসলমান সমাজের ভেতরের লিঙ্গ ন্যায়বিচার। তিন তালাক নিয়ে অতিরিক্ত মোহ বহু কম আলোচিত অন্যায়কে আড়াল করেছে। যৌতুক মুসলমান সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। ইসলামী আইনে স্বীকৃত নারীদের উত্তরাধিকার অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে।
এখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের দ্বিধা চোখে পড়ার মতো। এই ব্যর্থতাগুলো স্বীকার করা মানে চলমান প্রচেষ্টাগুলো অস্বীকার করা নয়। সারা ভারতে মুসলমান নারীদের সংগঠন, তরুণ আইনজীবী, গবেষক ও তৃণমূল কর্মীরা ইসলামী ঐতিহ্যের সমতাভিত্তিক ধারাগুলো পুনরুদ্ধার করছেন।
সব কিছুর ওপর ভাসমান রয়েছে জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন। আজ বহু মুসলমান নিজেকে বাধ্য মনে করেন আনুগত্য প্রদর্শনে—আরও জোরে কথা বলতে, দ্রুত ক্ষমা চাইতে, বৈশ্বিক মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট থেকে দূরত্ব দেখাতে। এই ভঙ্গি মর্যাদাপূর্ণ নয়, টেকসইও নয়। ভারতের সংবিধান অভিনয়নির্ভর জাতীয়তাবাদ দাবি করে না। এটি সমান নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়। বিবেকের স্বাধীনতা, আইনের চোখে সমতা এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে। সংবিধানের কথা বলা মানে দয়া ভিক্ষা করা নয়; এটি অধিকার দাবি করা। তাই অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের কাছে নতিস্বীকার হিসেবে নয়, বরং সাংবিধানিক আত্মবিশ্বাস হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। সংস্কার ও প্রতিরোধ পরস্পরবিরোধী নয়। এই মুহূর্তে তারা অবিচ্ছেদ্য।
আজ ভারতীয় মুসলমানরা এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। এক পথ নিয়ে যায় স্থায়ী আত্মরক্ষার দিকে, যেখানে প্রতিটি সমালোচনাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয় এবং প্রতিটি সংস্কার অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়। অন্য পথটি সাহস দাবি করে—আত্মসমর্পণ ছাড়া সংস্কার করার সাহস, ভয় ছাড়া কথা বলার সাহস, এবং নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে পূর্ণ ও সমান নাগরিকত্বের দাবি জানানোর সাহস।
এই কারণে, এমন এক সময়ে যখন মুসলমান পরিচয় নিরন্তর রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠছে, তখন সংস্কার ন্যায়ের লড়াই থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া নয়। বরং এটি সেই লড়াইয়েরই অপরিহার্য অংশ।
নাজীব জং ও হিলাল আহমদ 


















