০৭:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় গম চালান, বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে রাষ্ট্রদূতের সফর ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন করলে ভোটের পরেও ব্যবস্থা নেবে ইসি গাজীপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে নারী ও দুই শিশুর মৃত্যু শেখ হাসিনা থাকলে অন্তত একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলত: মির্জা ফখরুল সাদ্দামের জামিন: এবার স্ত্রী ও সন্তানের নীরব কবর দেখবে! পাকিস্তান–ভারত ম্যাচ বয়কটের ইঙ্গিত, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে কড়া অবস্থানে পিসিবি বাংলাদেশ প্রশাসন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে নতুন মুখ, সভাপতি কানিজ মৌলা ও মহাসচিব বাবুল মিয়া সমালোচনার ঝড়ে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগ ভারতের মুসলমানদের কাছে সংস্কার আজ কোনো বিভ্রান্তি নয়, ন্যায়ের লড়াইয়েরই অংশ ইইউ চুক্তি কেন ভারতীয় কৃষকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি লাভজনক

মহামারির প্রস্তুতি এক রাতে তৈরি হয় না

ভূমিকা

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম কোভিড–১৯-এর খবর জানে বিশ্ব। আজ সেই ভাইরাস আর শিরোনামে নেই, কিন্তু মহামারি তৈরির পরিবেশও হারিয়ে যায়নি। বদলে গেছে শুধু আমাদের মনোযোগ। শান্ত সময়ের প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করে সংকটকালে একটি দেশের সক্ষমতা। অথচ বিশ্বের অনেক জায়গায় সেই প্রস্তুতি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে।

শান্ত সময়েই গড়ে ওঠে প্রকৃত প্রস্তুতি

দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, সংকটের সময় নয়, বরং সংকটের মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়েই প্রস্তুতির ভিত্তি গড়ে ওঠে বা দুর্বল হয়ে পড়ে। মহামারি শুরু হলে তৎক্ষণাৎ নেওয়া পদক্ষেপেই সব নির্ধারিত হয় না। বছরের পর বছর গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, রোগ নজরদারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই তখনকার প্রতিক্রিয়াকে কার্যকর করে তোলে। এই ভিত্তি দুর্বল হলে হঠাৎ করেই সবাইকে পিছিয়ে পড়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরে কমিউনিকেবল ডিজিজেস এজেন্সি প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এটি জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতির প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের ইঙ্গিত। তবে শুধু কাঠামো থাকলেই প্রস্তুতি নিশ্চিত হয় না। সংকট না থাকলেও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, কার্যকর ব্যবস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা সক্রিয় ও সংযুক্ত রাখা জরুরি। এখানেই প্রস্তুতি সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়ে এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

How the world made so much progress on a Covid-19 vaccine so fast

মনোযোগ কমলে ঝুঁকি বাড়ে

কোভিড–১৯ মহামারির সময় বিজ্ঞান অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়েছে। এক বছরের কম সময়ে টিকা তৈরি সম্ভব হয়েছে, কারণ তার পেছনে ছিল বহু দশকের ভাইরাস, রোগপ্রতিরোধ ও টিকা–সংক্রান্ত গবেষণা। দ্রুত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছে, চিকিৎসা পদ্ধতি যাচাই হয়েছে, জিনগত নজরদারির মাধ্যমে ভাইরাসের গতিবিধি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে অনুসরণ করা গেছে। এগুলো কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ফল।

এই মহামারির মূল্য ছিল ভয়াবহ। বিশ্বজুড়ে প্রায় এক কোটি পঞ্চাশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তেরো দশমিক আট ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিঙ্গাপুরেও প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার সাতশোর বেশি মানুষ। প্রস্তুতি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, এর মূল্য মাপা হয় জীবন, জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষতিতে।

কিন্তু সংকট কেটে গেলে এই উপলব্ধি দ্রুত ফিকে হয়ে যায়। মনোযোগ অন্য দিকে সরে যায়, অর্থায়নের অগ্রাধিকার বদলে যায়, সংক্রামক রোগ গুরুত্বের তালিকা থেকে নেমে আসে। ক্যানসার বা বিপাকজনিত রোগের তুলনায় সংক্রামক রোগে বাণিজ্যিক লাভ কম হওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগও সীমিত থাকে। সরকারি গবেষণা তহবিলেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে, মহামারিকালীন অর্থায়ন ও বৈশ্বিক সহায়তা অনেক জায়গায় কমে গেছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কাঠামোয় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

World has 28% risk of new Covid-like pandemic within 10 years | The  Business Standard

নীরবে ক্ষয় হয় প্রস্তুতির সক্ষমতা

প্রস্তুতির গুরুত্ব কমে গেলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে দেখা দেয়। দক্ষ জনবল ছড়িয়ে পড়ে, প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম স্থবির হয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্থর হয়ে যায়। অথচ ঝুঁকি থেকেই যায়।

সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রতি বছর নতুন বৈশ্বিক মহামারি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দুই শতাংশ, অর্থাৎ আগামী বিশ বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্ভাবনা রয়েছে। কোভিডের স্মৃতি ম্লান হলে সতর্কতাও কমে যায়—এই সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

পাখির ফ্লু বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের মতো জীববৈজ্ঞানিক হুমকি সংবাদচক্রের ওপর নির্ভর করে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে না আনলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন প্রায় চার শতাংশ কমে যেতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।

সার্সের অভিজ্ঞতা এখনো পথ দেখায়

২০০৩ সালের সার্স প্রাদুর্ভাব তখনকার প্রস্তুতির বড় ঘাটতি সামনে এনেছিল। একই সঙ্গে এটি সংক্রামক রোগ গবেষণা, অবকাঠামো ও বিজ্ঞানী–চিকিৎসকদের সহযোগিতায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পথও খুলে দেয়। সেই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া গেছে কোভিড–১৯-এর সময়।

New S'pore-developed Covid-19 test kit that is faster, reduces need for  highly skilled manpower - CNA

সার্স–পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা সক্ষমতার কারণেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে কোভিডের ফোর্টিটিউড পরীক্ষাকিট তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। এতে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও রোগী আলাদা করা সহজ হয় এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গেও এটি ভাগ করা যায়। একইভাবে, ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য তৈরি বৈশ্বিক তথ্যভাণ্ডার পরবর্তী সময়ে কোভিডের ধরন শনাক্তের মেরুদণ্ডে পরিণত হয়।

চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণাও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করে। এটি মহামারি না হলেও, এ ধরনের গবেষণা ঝুঁকি মূল্যায়ন, চিকিৎসা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন হুমকি এলে যেন শূন্য থেকে শুরু করতে না হয়, সেটিই এর মূল উদ্দেশ্য।

গবেষণা থেকে বাস্তব প্রস্তুতি

সিঙ্গাপুরের বর্তমান প্রস্তুতি বহু বছরের পরিকল্পিত বিনিয়োগের ফল। উচ্চঝুঁকির জীবাণু নিয়ে নিরাপদে কাজ করার সক্ষমতা, দ্রুত হস্তক্ষেপ যাচাইয়ের সুযোগ এবং সমন্বিত ব্যবস্থাই এর ভিত্তি। তবে অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।

সিঙ্গাপুর ভিসা প্রসেসিং : সিঙ্গাপুর ভ্রমণ ভিসা পেতে যা করণীয় - ভ্রমণ গাইড

অনেক দেশ উন্নত গবেষণাগার থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব বিভাজন ও সমন্বয়ের অভাবে হিমশিম খেয়েছে। সিঙ্গাপুরের শক্তি হলো একযোগে কাজ করার সক্ষমতা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়। টিকা ও চিকিৎসা দ্রুত তৈরি ও প্রয়োগে বায়োম্যানুফ্যাকচারিং বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বও সমান জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়মিত সক্রিয় রাখতে হয়, সংকটে নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকে না।

সমষ্টিগত চর্চাই টেকসই প্রস্তুতি

কোনো একক দেশ বা প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক পর্যায়ে মহামারি প্রস্তুতির ঘাটতি একা পূরণ করতে পারে না। তবু শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা থাকা দেশগুলো ধারাবাহিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রোগ শুধু ব্যক্তিকে নয়, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজকেও প্রভাবিত করে—এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট হয়, বিজ্ঞানকে শেষ পর্যন্ত মানুষের সেবায়ই কাজ করতে হবে।

প্রস্তুতি কোনো এককালীন অর্জন নয়। এটি একটি ধারাবাহিক চর্চা, যা সংকটের আগে একসঙ্গে অনুশীলন করতে হয়। বিনিয়োগ ধরে রাখা, গবেষণা ও নজরদারিকে সংযুক্ত রাখা এবং দেশ ও সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতা জোরদার করাই ভবিষ্যৎ মহামারির আগে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় গম চালান, বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে রাষ্ট্রদূতের সফর

মহামারির প্রস্তুতি এক রাতে তৈরি হয় না

০৫:৩৭:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ভূমিকা

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম কোভিড–১৯-এর খবর জানে বিশ্ব। আজ সেই ভাইরাস আর শিরোনামে নেই, কিন্তু মহামারি তৈরির পরিবেশও হারিয়ে যায়নি। বদলে গেছে শুধু আমাদের মনোযোগ। শান্ত সময়ের প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করে সংকটকালে একটি দেশের সক্ষমতা। অথচ বিশ্বের অনেক জায়গায় সেই প্রস্তুতি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে।

শান্ত সময়েই গড়ে ওঠে প্রকৃত প্রস্তুতি

দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, সংকটের সময় নয়, বরং সংকটের মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়েই প্রস্তুতির ভিত্তি গড়ে ওঠে বা দুর্বল হয়ে পড়ে। মহামারি শুরু হলে তৎক্ষণাৎ নেওয়া পদক্ষেপেই সব নির্ধারিত হয় না। বছরের পর বছর গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, রোগ নজরদারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই তখনকার প্রতিক্রিয়াকে কার্যকর করে তোলে। এই ভিত্তি দুর্বল হলে হঠাৎ করেই সবাইকে পিছিয়ে পড়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরে কমিউনিকেবল ডিজিজেস এজেন্সি প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এটি জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতির প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের ইঙ্গিত। তবে শুধু কাঠামো থাকলেই প্রস্তুতি নিশ্চিত হয় না। সংকট না থাকলেও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, কার্যকর ব্যবস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা সক্রিয় ও সংযুক্ত রাখা জরুরি। এখানেই প্রস্তুতি সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়ে এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

How the world made so much progress on a Covid-19 vaccine so fast

মনোযোগ কমলে ঝুঁকি বাড়ে

কোভিড–১৯ মহামারির সময় বিজ্ঞান অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়েছে। এক বছরের কম সময়ে টিকা তৈরি সম্ভব হয়েছে, কারণ তার পেছনে ছিল বহু দশকের ভাইরাস, রোগপ্রতিরোধ ও টিকা–সংক্রান্ত গবেষণা। দ্রুত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছে, চিকিৎসা পদ্ধতি যাচাই হয়েছে, জিনগত নজরদারির মাধ্যমে ভাইরাসের গতিবিধি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে অনুসরণ করা গেছে। এগুলো কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ফল।

এই মহামারির মূল্য ছিল ভয়াবহ। বিশ্বজুড়ে প্রায় এক কোটি পঞ্চাশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তেরো দশমিক আট ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিঙ্গাপুরেও প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার সাতশোর বেশি মানুষ। প্রস্তুতি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, এর মূল্য মাপা হয় জীবন, জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষতিতে।

কিন্তু সংকট কেটে গেলে এই উপলব্ধি দ্রুত ফিকে হয়ে যায়। মনোযোগ অন্য দিকে সরে যায়, অর্থায়নের অগ্রাধিকার বদলে যায়, সংক্রামক রোগ গুরুত্বের তালিকা থেকে নেমে আসে। ক্যানসার বা বিপাকজনিত রোগের তুলনায় সংক্রামক রোগে বাণিজ্যিক লাভ কম হওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগও সীমিত থাকে। সরকারি গবেষণা তহবিলেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে, মহামারিকালীন অর্থায়ন ও বৈশ্বিক সহায়তা অনেক জায়গায় কমে গেছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কাঠামোয় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

World has 28% risk of new Covid-like pandemic within 10 years | The  Business Standard

নীরবে ক্ষয় হয় প্রস্তুতির সক্ষমতা

প্রস্তুতির গুরুত্ব কমে গেলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে দেখা দেয়। দক্ষ জনবল ছড়িয়ে পড়ে, প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম স্থবির হয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্থর হয়ে যায়। অথচ ঝুঁকি থেকেই যায়।

সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রতি বছর নতুন বৈশ্বিক মহামারি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দুই শতাংশ, অর্থাৎ আগামী বিশ বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্ভাবনা রয়েছে। কোভিডের স্মৃতি ম্লান হলে সতর্কতাও কমে যায়—এই সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

পাখির ফ্লু বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের মতো জীববৈজ্ঞানিক হুমকি সংবাদচক্রের ওপর নির্ভর করে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে না আনলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন প্রায় চার শতাংশ কমে যেতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।

সার্সের অভিজ্ঞতা এখনো পথ দেখায়

২০০৩ সালের সার্স প্রাদুর্ভাব তখনকার প্রস্তুতির বড় ঘাটতি সামনে এনেছিল। একই সঙ্গে এটি সংক্রামক রোগ গবেষণা, অবকাঠামো ও বিজ্ঞানী–চিকিৎসকদের সহযোগিতায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পথও খুলে দেয়। সেই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া গেছে কোভিড–১৯-এর সময়।

New S'pore-developed Covid-19 test kit that is faster, reduces need for  highly skilled manpower - CNA

সার্স–পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা সক্ষমতার কারণেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে কোভিডের ফোর্টিটিউড পরীক্ষাকিট তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। এতে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও রোগী আলাদা করা সহজ হয় এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গেও এটি ভাগ করা যায়। একইভাবে, ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য তৈরি বৈশ্বিক তথ্যভাণ্ডার পরবর্তী সময়ে কোভিডের ধরন শনাক্তের মেরুদণ্ডে পরিণত হয়।

চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণাও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করে। এটি মহামারি না হলেও, এ ধরনের গবেষণা ঝুঁকি মূল্যায়ন, চিকিৎসা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন হুমকি এলে যেন শূন্য থেকে শুরু করতে না হয়, সেটিই এর মূল উদ্দেশ্য।

গবেষণা থেকে বাস্তব প্রস্তুতি

সিঙ্গাপুরের বর্তমান প্রস্তুতি বহু বছরের পরিকল্পিত বিনিয়োগের ফল। উচ্চঝুঁকির জীবাণু নিয়ে নিরাপদে কাজ করার সক্ষমতা, দ্রুত হস্তক্ষেপ যাচাইয়ের সুযোগ এবং সমন্বিত ব্যবস্থাই এর ভিত্তি। তবে অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।

সিঙ্গাপুর ভিসা প্রসেসিং : সিঙ্গাপুর ভ্রমণ ভিসা পেতে যা করণীয় - ভ্রমণ গাইড

অনেক দেশ উন্নত গবেষণাগার থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব বিভাজন ও সমন্বয়ের অভাবে হিমশিম খেয়েছে। সিঙ্গাপুরের শক্তি হলো একযোগে কাজ করার সক্ষমতা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়। টিকা ও চিকিৎসা দ্রুত তৈরি ও প্রয়োগে বায়োম্যানুফ্যাকচারিং বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বও সমান জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়মিত সক্রিয় রাখতে হয়, সংকটে নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকে না।

সমষ্টিগত চর্চাই টেকসই প্রস্তুতি

কোনো একক দেশ বা প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক পর্যায়ে মহামারি প্রস্তুতির ঘাটতি একা পূরণ করতে পারে না। তবু শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা থাকা দেশগুলো ধারাবাহিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রোগ শুধু ব্যক্তিকে নয়, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজকেও প্রভাবিত করে—এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট হয়, বিজ্ঞানকে শেষ পর্যন্ত মানুষের সেবায়ই কাজ করতে হবে।

প্রস্তুতি কোনো এককালীন অর্জন নয়। এটি একটি ধারাবাহিক চর্চা, যা সংকটের আগে একসঙ্গে অনুশীলন করতে হয়। বিনিয়োগ ধরে রাখা, গবেষণা ও নজরদারিকে সংযুক্ত রাখা এবং দেশ ও সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতা জোরদার করাই ভবিষ্যৎ মহামারির আগে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।