০৭:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
গাজীপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে নারী ও দুই শিশুর মৃত্যু শেখ হাসিনা থাকলে অন্তত একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলত: মির্জা ফখরুল সাদ্দামের জামিন: এবার স্ত্রী ও সন্তানের নীরব কবর দেখবে! পাকিস্তান–ভারত ম্যাচ বয়কটের ইঙ্গিত, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে কড়া অবস্থানে পিসিবি বাংলাদেশ প্রশাসন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে নতুন মুখ, সভাপতি কানিজ মৌলা ও মহাসচিব বাবুল মিয়া সমালোচনার ঝড়ে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগ ভারতের মুসলমানদের কাছে সংস্কার আজ কোনো বিভ্রান্তি নয়, ন্যায়ের লড়াইয়েরই অংশ ইইউ চুক্তি কেন ভারতীয় কৃষকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি লাভজনক সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা অপরিহার্য রিপাবলিক ডে প্যারেডে অপারেশন সিঁদুর: ভারতের প্রতিরক্ষা ভাবনায় এক নতুন অধ্যায়

দত্তক বাণিজ্যের অশুভ ছায়া: এক বছর আগেই সতর্কবার্তা পেয়েছিল সিঙ্গাপুর সরকার

২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় শিশু পাচারচক্র ফাঁস হওয়ার এক বছর আগেই সিঙ্গাপুরের সমাজ ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রণালয় একটি সন্দেহজনক তথ্য পেয়েছিল। ২০২৪ সালের এপ্রিলে একটি দত্তক সংস্থার প্রধানকে ফোন করে এক নারী নিজেকে ইন্দোনেশিয়ার পন্টিয়ানাকের এজেন্ট পরিচয় দিয়ে শিশু সরবরাহের প্রস্তাব দেন। ভুয়া ডিএনএ ও জন্মসনদের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ফোনকলের ভয়ংকর প্রস্তাব

লোটাস চাইল্ড অ্যাডপশন এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যালিস কাভেরি ফোনটি পাওয়ার পরই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। একই দিনে তিনি ইমেইলের মাধ্যমে বিষয়টি সমাজ ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রণালয়কে জানান। ফোনদাতা দাবি করেছিলেন, ইতিমধ্যে চারজন ইন্দোনেশীয় শিশুকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে এবং আরও কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পর্যালোচনা

MSF alerted by adoption agent in 2024 about suspicious baby 'supply' from  Indonesia to S'pore

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইমেইল পাওয়ার পর ওই বর্ণনার সঙ্গে মিল রয়েছে এমন দত্তক আবেদনগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছিল। তবে তখনকার তথ্যের ভিত্তিতে কোনো অসঙ্গতি বা অপরাধের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। সে কারণে আবেদন বাতিল বা তদন্ত শুরুর মতো অবস্থাও তৈরি হয়নি।

২০২৫ সালে প্রকাশ্যে আসে পাচারচক্র

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ একটি বড় শিশু পাচারচক্রের সন্ধান পায়। তদন্তে জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকে অন্তত পঁচিশটি শিশুকে বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে পনেরোটি শিশুকে জাকার্তা হয়ে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। পশ্চিম জাভা পুলিশের বিশেষ অপরাধ বিভাগের প্রধান জানান, পাচারচক্রের মূল সন্দেহভাজন পন্টিয়ানাকভিত্তিক এবং সেখানে তার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে।

পুরোনো ফোনকলের সঙ্গে যোগসূত্র অনিশ্চিত

২০২৪ সালে পাওয়া ফোনকলটি এই একই চক্রের অংশ কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ২০২৫ সালে গণমাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দিষ্ট নাম পাওয়ার পর সিঙ্গাপুর সরকার সংশ্লিষ্ট দত্তক মামলাগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

New Year babies: The first MSF newborns of 2024 | MSF UK

দুই দেশের যৌথ তদন্ত

সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া সরকার যৌথভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। লক্ষ্য একটাই—শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং অভিযোগগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা। ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত ছাব্বিশজন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দালাল, ভুয়া মা, শিশু দেখভালকারী ও নথি জালকারীরা রয়েছে।

সিঙ্গাপুরের দত্তক এজেন্টদের নাম

ইন্দোনেশিয়ার তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, সিঙ্গাপুরের তিনজন দত্তক এজেন্ট এই চক্রে জড়িত ছিলেন। বিচার শুরু হলে তাদের পূর্ণ নাম প্রকাশ করা হবে। জানা গেছে, প্রতিটি শিশুর জন্য দত্তক গ্রহণে বিশ হাজার ডলারের বেশি অর্থ লেনদেন হয়েছে।

দত্তক প্রক্রিয়ায় কঠোর আইন

সিঙ্গাপুরে দত্তক নিতে হলে বাধ্যতামূলক ব্রিফিং ও উপযুক্ততা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আইন আরও কঠোর করা হয়েছে। এখন জৈবিক অভিভাবকদের স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সামনে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয় এবং নথিপত্র আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোরভাবে যাচাই করা হয়।

MSF alerted to suspicious baby 'supply' from Indonesia in 2024 | The  Straits Times

স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

কিছু দত্তক এজেন্ট স্বীকার করেছেন, বিদেশ থেকে সন্দেহজনক ফোনকল তারা আগেও পেয়েছেন। আবার অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও দুটি আলাদা বিল করা হয়—একটি কর্তৃপক্ষের জন্য, অন্যটি গোপনে। তবে আইনজীবীরা বলছেন, সঠিক নিয়ম মেনে চলা দত্তক অভিভাবকেরা সাধারণত আইনি ঝুঁকিতে পড়েন না।

দত্তক অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা

কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, জন্মসনদের সত্যতা যাচাই করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল না। অনেকে শেষ পর্যন্ত সরকারের যাচাই ব্যবস্থার ওপর ভরসা রেখেছেন। আবার কেউ কেউ পুরো প্রক্রিয়াকে পণ্য কেনাবেচার মতো মনে হওয়ায় দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।

শিশুর স্বার্থই মূল বিবেচনা

আইনজীবী ও সমাজকর্মীরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায়। দত্তক প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরাই। তাই দুই দেশের কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর ও সমন্বিত নজরদারি জরুরি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজীপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে নারী ও দুই শিশুর মৃত্যু

দত্তক বাণিজ্যের অশুভ ছায়া: এক বছর আগেই সতর্কবার্তা পেয়েছিল সিঙ্গাপুর সরকার

০৫:১১:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় শিশু পাচারচক্র ফাঁস হওয়ার এক বছর আগেই সিঙ্গাপুরের সমাজ ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রণালয় একটি সন্দেহজনক তথ্য পেয়েছিল। ২০২৪ সালের এপ্রিলে একটি দত্তক সংস্থার প্রধানকে ফোন করে এক নারী নিজেকে ইন্দোনেশিয়ার পন্টিয়ানাকের এজেন্ট পরিচয় দিয়ে শিশু সরবরাহের প্রস্তাব দেন। ভুয়া ডিএনএ ও জন্মসনদের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ফোনকলের ভয়ংকর প্রস্তাব

লোটাস চাইল্ড অ্যাডপশন এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যালিস কাভেরি ফোনটি পাওয়ার পরই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। একই দিনে তিনি ইমেইলের মাধ্যমে বিষয়টি সমাজ ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রণালয়কে জানান। ফোনদাতা দাবি করেছিলেন, ইতিমধ্যে চারজন ইন্দোনেশীয় শিশুকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে এবং আরও কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পর্যালোচনা

MSF alerted by adoption agent in 2024 about suspicious baby 'supply' from  Indonesia to S'pore

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইমেইল পাওয়ার পর ওই বর্ণনার সঙ্গে মিল রয়েছে এমন দত্তক আবেদনগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছিল। তবে তখনকার তথ্যের ভিত্তিতে কোনো অসঙ্গতি বা অপরাধের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। সে কারণে আবেদন বাতিল বা তদন্ত শুরুর মতো অবস্থাও তৈরি হয়নি।

২০২৫ সালে প্রকাশ্যে আসে পাচারচক্র

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ একটি বড় শিশু পাচারচক্রের সন্ধান পায়। তদন্তে জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকে অন্তত পঁচিশটি শিশুকে বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে পনেরোটি শিশুকে জাকার্তা হয়ে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। পশ্চিম জাভা পুলিশের বিশেষ অপরাধ বিভাগের প্রধান জানান, পাচারচক্রের মূল সন্দেহভাজন পন্টিয়ানাকভিত্তিক এবং সেখানে তার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে।

পুরোনো ফোনকলের সঙ্গে যোগসূত্র অনিশ্চিত

২০২৪ সালে পাওয়া ফোনকলটি এই একই চক্রের অংশ কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ২০২৫ সালে গণমাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দিষ্ট নাম পাওয়ার পর সিঙ্গাপুর সরকার সংশ্লিষ্ট দত্তক মামলাগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

New Year babies: The first MSF newborns of 2024 | MSF UK

দুই দেশের যৌথ তদন্ত

সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া সরকার যৌথভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। লক্ষ্য একটাই—শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং অভিযোগগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা। ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত ছাব্বিশজন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দালাল, ভুয়া মা, শিশু দেখভালকারী ও নথি জালকারীরা রয়েছে।

সিঙ্গাপুরের দত্তক এজেন্টদের নাম

ইন্দোনেশিয়ার তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, সিঙ্গাপুরের তিনজন দত্তক এজেন্ট এই চক্রে জড়িত ছিলেন। বিচার শুরু হলে তাদের পূর্ণ নাম প্রকাশ করা হবে। জানা গেছে, প্রতিটি শিশুর জন্য দত্তক গ্রহণে বিশ হাজার ডলারের বেশি অর্থ লেনদেন হয়েছে।

দত্তক প্রক্রিয়ায় কঠোর আইন

সিঙ্গাপুরে দত্তক নিতে হলে বাধ্যতামূলক ব্রিফিং ও উপযুক্ততা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আইন আরও কঠোর করা হয়েছে। এখন জৈবিক অভিভাবকদের স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সামনে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয় এবং নথিপত্র আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোরভাবে যাচাই করা হয়।

MSF alerted to suspicious baby 'supply' from Indonesia in 2024 | The  Straits Times

স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

কিছু দত্তক এজেন্ট স্বীকার করেছেন, বিদেশ থেকে সন্দেহজনক ফোনকল তারা আগেও পেয়েছেন। আবার অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও দুটি আলাদা বিল করা হয়—একটি কর্তৃপক্ষের জন্য, অন্যটি গোপনে। তবে আইনজীবীরা বলছেন, সঠিক নিয়ম মেনে চলা দত্তক অভিভাবকেরা সাধারণত আইনি ঝুঁকিতে পড়েন না।

দত্তক অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা

কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, জন্মসনদের সত্যতা যাচাই করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল না। অনেকে শেষ পর্যন্ত সরকারের যাচাই ব্যবস্থার ওপর ভরসা রেখেছেন। আবার কেউ কেউ পুরো প্রক্রিয়াকে পণ্য কেনাবেচার মতো মনে হওয়ায় দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।

শিশুর স্বার্থই মূল বিবেচনা

আইনজীবী ও সমাজকর্মীরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায়। দত্তক প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরাই। তাই দুই দেশের কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর ও সমন্বিত নজরদারি জরুরি।