সিজোফ্রেনিয়া সাধারণত মস্তিষ্কের একটি জটিল মানসিক রোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বড় আকারের জেনেটিক গবেষণা দেখাচ্ছে, এই রোগের প্রভাব শুধু মস্তিষ্কেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং হাড়ের স্বাস্থ্যেও এর ছাপ পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে করা এই গবেষণায় সিজোফ্রেনিয়া ও হাড়ের ভঙ্গুরতার মধ্যে আংশিক জেনেটিক মিলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসকরা লক্ষ করে আসছেন, শিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হাড় দুর্বল হওয়া ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ শরীরের বিপাক ও হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপানের প্রবণতা এবং ভিটামিন ডি–এর ঘাটতি এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
জেনেটিক গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
জেনোমিক সাইকিয়াট্রি সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় গবেষকেরা অর্ধ মিলিয়নের বেশি মানুষের জেনেটিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। চীনের তিয়ানজিন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় জেনারেল হাসপাতালের অধ্যাপক ফেং লিউয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই বিশ্লেষণের লক্ষ্য ছিল, সিজোফ্রেনিয়া ও হাড়ের দুর্বলতার মধ্যে কোনো সাধারণ জেনেটিক প্রভাব রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা।
গবেষকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এটি এমন নয় যে একটি জিন সরাসরি দুটি রোগের কারণ। বরং ডিএনএর কিছু নির্দিষ্ট অংশ এমনভাবে কাজ করতে পারে, যা শরীরের ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। আগের অনেক গবেষণায় এই সম্পর্ক খুব দুর্বল মনে হলেও, নতুন বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম জেনেটিক মিল ধরা পড়েছে।

হাড়ের সব অংশে নয়, বিশেষ জায়গায় মিল
গবেষণায় দেখা গেছে, এই জেনেটিক মিল পুরো কঙ্কালজুড়ে সমান নয়। বিশেষ করে পায়ের গোড়ালির হাড়ের শক্তির সঙ্গে সিজোফ্রেনিয়ার জেনেটিক মিল তুলনামূলক বেশি। শরীরের অন্যান্য হাড়ে এই সম্পর্ক অনেক দুর্বল। গবেষকদের মতে, গোড়ালির হাড় শরীরের ওজন বহন করে এবং বিপাক ও বিকাশজনিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যা সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক পথের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
তবে এই ফল ব্যাখ্যায় সতর্ক থাকার কথাও বলা হয়েছে। গোড়ালির হাড় নিয়ে তুলনামূলক বেশি গবেষণা হওয়ায় সেখানে জেনেটিক সংকেত শনাক্ত করা সহজ হয়েছে। ভবিষ্যতে শরীরের অন্যান্য হাড় নিয়ে একই মাত্রার বড় গবেষণা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
চিকিৎসায় কী প্রভাব পড়বে
এই গবেষণা চিকিৎসা ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন আনছে না। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যাপক বিক্রম প্যাটেলের মতে, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অকাল মৃত্যুর বড় কারণ হলো অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক রোগ, যেগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। নতুন এই জেনেটিক তথ্য সহাবস্থানকারী সমস্যাগুলোর পেছনের একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করলেও, বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না।
মনোরোগ চিকিৎসায় হাড়ের স্বাস্থ্য সাধারণত অগ্রাধিকার পায় না। চিকিৎসকেরা ওষুধ দেওয়ার সময় তাৎক্ষণিক ঝুঁকি যেমন পড়ে যাওয়া বা রক্তচাপ কমে যাওয়ার দিকে বেশি নজর দেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে হাড় ক্ষয় বা ভবিষ্যৎ ভাঙনের ঝুঁকি প্রায় আলোচনায় আসে না। সিজোফ্রেনিয়া অনেক সময় অল্প বয়সে ধরা পড়ে, যখন হাড়ের দুর্বলতা নিয়ে ভাবার প্রবণতা কম থাকে। ফলে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই দিকটি চিকিৎসার ফাঁকেই থেকে যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















