বিশ্ব রাজনীতির উত্তাপ অনেক সময় সরাসরি ঘরে ঢুকে পড়ে। গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের এক কফিশপে বসে সেই বাস্তবতাই অনুভব করছিলেন আইনজীবী লিকে লিনগে। চার সন্তান গরম চকোলেট চুমুক দিচ্ছিল, বাইরে কী চলছে তা নিয়ে যেন তাদের কোনো ভাবনাই নেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছিল মায়ের মনে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের ক্ষমতায় ফিরে গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করার পর থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ঢুকে পড়েছে এই আর্কটিক দ্বীপের পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে।
রাজনৈতিক উত্তেজনার ছায়া ঘরে ঘরে
ট্রাম্পের বক্তব্য কখনো কড়া, কখনো হুমকির সুরে ভরা। এসব কথা বড়দের মধ্যেই শুধু নয়, শিশুদের মাঝেও ভয়ের জন্ম দিচ্ছে। লিকে লিনগে বলছেন, বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে ঠিকই, তবে বিশ্বাস আর মূল্যবোধই তাঁকে মানসিক শান্তি দেয়। দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি আরও উচ্চতর কিছু আদর্শ আছে, যা তাঁকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে সাহায্য করে। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি সন্তানদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।

শিশুদের কথা ভাবনায় প্রশাসনের উদ্যোগ
এই উদ্বেগ শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্পের শপথ নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যেখানে অনিশ্চয়তার সময়ে শিশুদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। এই উদ্যোগে জাতিসংঘের শিশু সংস্থার সহযোগিতাও ছিল। নির্দেশিকায় অভিভাবকদের শান্ত থাকার, শিশুদের কথা মন দিয়ে শোনার, তাদের অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার এবং অতিরিক্ত খবর দেখার অভ্যাস কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
ইউনিসেফের এক কর্মকর্তা জানান, এখন শিশুদের তথ্যের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অনেক সময় তারা এমন সব খবর দেখছে, যা তাদের বয়সের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। ফলে বড়দের আরও সচেতন ও সুরক্ষামূলক ভূমিকা নিতে হচ্ছে। শিশুদের সঙ্গে তারা কী দেখছে ও শুনছে, সে বিষয়ে খোলামেলা কথা বলা জরুরি হয়ে উঠেছে, কারণ রাজনৈতিক ভাষ্য দিন দিন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।
উত্তর না জানা প্রশ্নের চাপ
তবে সন্তানদের আশ্বস্ত করা সব সময় সহজ নয়। অনেক প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছেও নেই। পরামর্শক আরনাক্কুলুক জো ক্লাইস্ট তাঁর তেরো বছরের মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন। মেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটালেও খুব একটা নার্ভাস নয়। তবু মাঝেমধ্যে এমন প্রশ্ন করে, যার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর কারও কাছেই নেই। এই অসহায়ত্বই এখন অনেক অভিভাবকের বাস্তবতা।
ইনুইট সংস্কৃতি থেকে শক্তি
এই কঠিন সময় মোকাবিলায় গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট সংস্কৃতিও সহায় হয়ে উঠছে। ইতিহাসজুড়ে নানা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস আছে এই সমাজের। কীভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায় এবং নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কী করা সম্ভব, সেই ভাবনাই পরিবারগুলোকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগাচ্ছে।

শিশুদের কণ্ঠে প্রতিবাদ
শুধু বড়রাই নন, অনেক শিশু-কিশোরও নিজেদের ভাষায় বার্তা দিচ্ছে বিশ্বকে। সাত বছরের মার্লে ও তার চৌদ্দ বছরের বোন মিলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছেছে। সেখানে সরল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে তারা জানায়, ট্রাম্পের বক্তব্য গ্রিনল্যান্ডের শিশুদের ভয় পাইয়ে দিচ্ছে এবং গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। তাদের মা বলেন, এটি শিশুদের মানসিকভাবে সামলে নেওয়ার একটি উপায়। বিষয়টি গুরুতর হলেও উপস্থাপনায় শিশুসুলভ সরলতা আছে, যা বার্তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















