ভারতের ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনীতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী, দীর্ঘ দুই দশক বিবিসির ভারত কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেওয়া এবং বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নানা সন্ধিক্ষণে লক্ষ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠ হয়ে ওঠা মার্ক টালি রোববার প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
ব্রিটিশ শাসনামলের তৎকালীন কলকাতায় ১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি ভারতকেই নিজের ঘর ও কর্মভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বিদেশি সংবাদদাতাদের মধ্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক স্বর্ণমানদণ্ড। কয়েক দশক ধরে তাঁর গভীর, ভারী কণ্ঠ ভারত নিয়ে ধারাভাষ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, বাবরি মসজিদ ধ্বংস—এমন বহু ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বর্ণনাকারী ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন এই সংবাদপত্রের নিয়মিত রবিবারের কলামিস্টও ছিলেন টালি।

পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও ব্রিটিশ নাইটহুডে ভূষিত মার্ক টালিকে ২১ জানুয়ারি দক্ষিণ দিল্লির সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫ জানুয়ারি দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্ট্রোকের পর একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোকপ্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকতার এক বিশাল কণ্ঠস্বরকে দেশ হারাল। ভারতের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ তাঁর কাজের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ জনপরিসরের আলোচনায় স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
জীবনের প্রথম দশক ভারতে কাটিয়ে দার্জিলিংয়ের একটি আবাসিক স্কুলে পড়াশোনা করেন টালি। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যান ইংল্যান্ডে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কিছুদিন সেমিনারিতেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি আবার ভারতে ফিরে এসে নয়াদিল্লিতে বিবিসির দপ্তরে প্রশাসনিক কাজে যোগ দেন। লন্ডনে বিবিসির হিন্দি ও ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে স্বল্পকাল কাজ করার পর ১৯৭১ সালে নয়াদিল্লিতে বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে নিযুক্ত হন।
কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ব্যুরো চিফ হন এবং প্রায় দুই দশক ধরে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদ কভারেজের দায়িত্ব সামলান। বিবিসি নিউজের অন্তর্বর্তী প্রধান জোনাথন মনরো এক বিবৃতিতে বলেন, মার্ক টালি তাঁর প্রতিবেদনের মাধ্যমে ভারতকে বিশ্বের সামনে খুলে ধরেছিলেন। দেশের বৈচিত্র্য ও প্রাণশক্তি তিনি যুক্তরাজ্যসহ সারা বিশ্বের দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

টালির দীর্ঘ সাংবাদিকজীবন অনেক সময় ভারতের নিজস্ব যাত্রাপথের সঙ্গেই একাকার হয়ে গেছে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থা, ১৯৭৯ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি, অপারেশন ব্লু স্টার, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা ও শিখবিরোধী দাঙ্গা, ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস—সবই তাঁর প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে।
অপারেশন ব্লু স্টার ও পাঞ্জাব সংকট ছিল তাঁর প্রথম বই ‘অমৃতসর: মিসেস গান্ধীর শেষ যুদ্ধ’-এর বিষয়, যা সাংবাদিক সতীশ জ্যাকবের সঙ্গে যৌথভাবে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ‘নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ে তাঁর ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া দশটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক নিবন্ধ সংকলিত হয়। সেখানে অপারেশন ব্লু স্টার, রূপ কনওয়ার সতী প্রথা মামলা, রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ’ ধারাবাহিক এবং ১৯৭৭ সালের কুম্ভমেলার মতো বিষয় উঠে আসে। বইয়ের ভূমিকায় তিনি লেখেন, এই গল্পগুলো পশ্চিমা চিন্তাধারা কীভাবে ভারতীয় জীবনকে বিকৃত করেছে তা বোঝাতে সাহায্য করবে। ভারতের দারিদ্র্যের সমাধান এখানে নেই, তবে সমাধানের সূত্র খোঁজার শুরুটা ভারতের মধ্যেই হওয়া উচিত।
১৯৯২ সালে তিনি পদ্মশ্রী, ২০০২ সালে ব্রিটিশ নববর্ষ সম্মানসূচিতে নাইট উপাধি এবং ২০০৫ সালে পদ্মভূষণে সম্মানিত হন। ১৯৯৪ সালে তিনি বিবিসি থেকে পদত্যাগ করেন, তখনকার প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে সংস্থাটি চালানোর অভিযোগ তুলে।

মোট দশটি বইয়ে, কল্পকাহিনি ও প্রবন্ধ মিলিয়ে, টালি সবসময়ই ভারতকে কেন্দ্রে রেখেছেন। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে তাঁকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে ১৮ মাস পর তিনি আবার ফিরে আসেন। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদের সামনে উত্তেজিত জনতার একাংশ বিবিসিকে সন্দেহ করে তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং তাঁকে কয়েক ঘণ্টা একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে এক স্থানীয় কর্মকর্তা ও এক পুরোহিতের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান।
এই সংবাদপত্রে তাঁর লেখালেখি বিস্তৃত ছিল—আধ্যাত্মিকতা থেকে সমসাময়িক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থেকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার পর্যন্ত। ২০১৩ সালে তিনি লিখেছিলেন, রাজ আমলের ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠান ও সেকেলে আইন আজও টিকে আছে। ঔপনিবেশিক বাংলোর অহংকারী কালেক্টর থেকে শুরু করে উন্নয়ন আটকে দেয় বলে পরিচিত ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তা, আধাসামরিক পতাকা উড়িয়ে চলা উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা থেকে এফআইআর নথিভুক্ত করতে অনীহা দেখানো থানাদার—এরা সবাই স্বরাজ নয়, রাষ্ট্ররাজের প্রতীক।
ভারত ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে তিনি গভীরভাবে ভাবতেন। বিদেশি নাগরিক হিসেবে ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে তিনি গর্ব অনুভব করতেন যে তিনি যুক্তরাজ্য ও ভারতের—দুটি দেশের সঙ্গেই যুক্ত থাকতে পেরেছেন। ২০২৩ সালে এই পত্রিকায় লেখা এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, আমরা ভারতে বাস করি এবং এতে আমাদের গর্ব করা উচিত। এটি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। প্রতিবেশী অনেক দেশের মতো আমরা কখনও স্বৈরতন্ত্রে নেমে যাইনি। কথাগুলো সত্য, কিন্তু জীবন ও গণতন্ত্র স্থির নয়। আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, আমাদের গণতন্ত্র সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
ধ্রুব জ্যোতি 



















