০৩:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
ইউরোপে নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা, ন্যাটোকে সীমিত হামলায় পরীক্ষা করতে পারেন পুতিন আকাশযুদ্ধের কিংবদন্তি ল্যাঙ্কাস্টার: ভুল পরিকল্পনা থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ বোমারু বিমানের উত্থান ‘প্যানজার’ ভেবে ভুল, আসলে ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী প্যাটন ট্যাংক চীনের চাপের মুখে যুদ্ধপ্রস্তুতি জোরদার, তাইওয়ানের বৃহত্তম সামরিক মহড়া শুরু এক দশকের ভালোবাসার প্রতিদান, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম স্টেডিয়াম কনসার্ট নিয়ে ফিরছেন চার্লি পুথ রোগীর আস্থা ছাড়া স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফল ব্যবহার সম্ভব নয়: সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাপটের গাড়ি থেকে ‘ভয়ের প্রতীক’: কেন বদলে গেল মাহিন্দ্রা থারের ভাবমূর্তি? কর্মক্ষেত্রে আহত শ্রমিকদের আইনি লড়াই কঠিন হয়ে উঠছে, আইনজীবীর সংকটে বাড়ছে ভোগান্তি জাতিসংঘের সামনে তিব্বতি কর্মীর আত্মাহুতি, নতুন করে আলোচনায় তিব্বত আন্দোলন ব্ল্যাকপিঙ্কের ১০ বছর: উদযাপনের অপেক্ষায় ভক্তরা, কিন্তু বাড়ছে হতাশা

ইরানে দমন–পীড়নের পর গভীর অন্ধকারে দেশ, ভাঙা মনোবল আর নিঃসঙ্গতায় ডুবে মানুষ

ইরানের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ নির্মমভাবে দমন করার পর দেশজুড়ে নেমে এসেছে ভয়, হতাশা আর শোকের ভারী ছায়া। রাজধানী তেহরান থেকে প্রান্তিক শহর পর্যন্ত মানুষের চোখেমুখে এখন একই প্রশ্ন—এর পর কী। অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ যে এভাবে রক্তাক্ত পরিণতিতে পৌঁছাবে, তা অনেকেই কল্পনা করেননি।

তেহরানে আন্দোলনের শুরু ও অংশগ্রহণ
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার এলাকায় হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদ। সারা নামে এক তরুণী প্রথমে ছিলেন কেবল পথচারী। কিন্তু জানুয়ারির আট তারিখে তিনি নিজেই যোগ দেন বিক্ষোভে। তার ভাষায়, এ বার পরিস্থিতি আলাদা মনে হয়েছিল। দেশের প্রতিটি কোণে মানুষ যেন চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল এই ঢেউ আর থামানো যাবে না।

কিন্তু এই আশা খুব দ্রুতই ভেঙে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ছিল নজিরবিহীনভাবে কঠোর। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ নিহত হন, অসংখ্য আহত ও গ্রেপ্তার হন। সারা নিজেও টিয়ার গ্যাসের প্রভাবে মারাত্মকভাবে আহত হন। তার মুখে সংক্রমিত ক্ষত আর ঘা, কণ্ঠে চাপা কান্না। তিনি বলেন, চারপাশটা যেন নরকের মতো। যাকে চিনি, তার পরিবারের কেউ না কেউ হয় মারা গেছে, নয়তো গ্রেপ্তার হয়েছে।

After protests crushed, Iranian tells ToI many still hoping for US, Israel  'savior' | The Times of Israel

রাস্তায় কার্যত সামরিক অবস্থা
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং পুলিশ যৌথভাবে শহরজুড়ে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। চেকপোস্টে গাড়ি থামানো হচ্ছে, মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এক সময় যেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল, সেখানে এখন নীরবতা আর আতঙ্ক। এক বাসিন্দা বলেন, মনে হয় সবাইকে হঠাৎ বাতাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগের সেই আগুন আর নেই।

ভাঙা মনোবল আর নিঃশব্দ শোক
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশের ভেতরের বাস্তবতা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অল্প সময়ের জন্য সংযোগ মিললে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা হলো হতাশা। কারাজ শহরের এক যুবক বলেন, মানুষের মনোবল ভেঙে গেছে, সবার মুখেই সেটা দেখা যায়। দোকানপাট খুলছে পুলিশের চাপে, যেন সবকিছু স্বাভাবিক দেখানো যায়। অথচ বাস্তবে বাজার খোলা রাখাই হচ্ছে জোর করে।

তেহরানের আরেক বাসিন্দা জানান, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলেও তা এখন নীরব শোকসভায় পরিণত হয়। দেশের ভেতরের বাস্তবতার সঙ্গে প্রবাসী সংবাদমাধ্যমে দেখানো চিত্রের বড় ফারাক তাদের আরও একা করে তুলছে। তার পরিবারের চারজন সদস্য এই আন্দোলনে নিহত হয়েছেন। তার কথায়, দেশের বাইরে যা দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে এখানে তেমন কিছুই নেই। এখানে কেবল নিরাশা।

Iran Protests: Brutal Crackdown Kills Thousands, Spreads Fear - Bloomberg

নিহত ও গ্রেপ্তারের ভয়াবহ সংখ্যা
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরের শেষ থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আরও হাজার হাজার ঘটনার যাচাই চলছে এবং কয়েক দশক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি চিকিৎসকদের অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী তা আরও অনেক বেশি হতে পারে। হাসপাতালে আহতদের অনেককেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি করা হয়নি, কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ে চিকিৎসকরাও আতঙ্কে আছেন।

অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর আঘাত
ইন্টারনেট বন্ধ এবং মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির। আগে থেকেই সংকটে থাকা অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে। এক ব্যবসায়ী নারী জানান, গত এক বছরে তার প্রতিষ্ঠানের কাজ হয়েছে মাত্র কয়েক মাসের সমান। ব্যাংকিং লেনদেন পর্যন্ত ব্যাহত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবেই প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের আয় হারাচ্ছে দেশ।

After brutal crushing of protests, Iranians stare into abyss | The Straits  Times

ক্ষমতার ভাষ্য ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল না; বিদেশি শক্তির উসকানিতে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ঐক্যমত নেই। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছেন, কেউ আবার আরও বড় সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর কথায়, যদি কিছু না বদলায়, এই চক্র চলতেই থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপে নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা, ন্যাটোকে সীমিত হামলায় পরীক্ষা করতে পারেন পুতিন

ইরানে দমন–পীড়নের পর গভীর অন্ধকারে দেশ, ভাঙা মনোবল আর নিঃসঙ্গতায় ডুবে মানুষ

০২:৪৬:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ইরানের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ নির্মমভাবে দমন করার পর দেশজুড়ে নেমে এসেছে ভয়, হতাশা আর শোকের ভারী ছায়া। রাজধানী তেহরান থেকে প্রান্তিক শহর পর্যন্ত মানুষের চোখেমুখে এখন একই প্রশ্ন—এর পর কী। অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ যে এভাবে রক্তাক্ত পরিণতিতে পৌঁছাবে, তা অনেকেই কল্পনা করেননি।

তেহরানে আন্দোলনের শুরু ও অংশগ্রহণ
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার এলাকায় হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদ। সারা নামে এক তরুণী প্রথমে ছিলেন কেবল পথচারী। কিন্তু জানুয়ারির আট তারিখে তিনি নিজেই যোগ দেন বিক্ষোভে। তার ভাষায়, এ বার পরিস্থিতি আলাদা মনে হয়েছিল। দেশের প্রতিটি কোণে মানুষ যেন চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল এই ঢেউ আর থামানো যাবে না।

কিন্তু এই আশা খুব দ্রুতই ভেঙে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ছিল নজিরবিহীনভাবে কঠোর। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ নিহত হন, অসংখ্য আহত ও গ্রেপ্তার হন। সারা নিজেও টিয়ার গ্যাসের প্রভাবে মারাত্মকভাবে আহত হন। তার মুখে সংক্রমিত ক্ষত আর ঘা, কণ্ঠে চাপা কান্না। তিনি বলেন, চারপাশটা যেন নরকের মতো। যাকে চিনি, তার পরিবারের কেউ না কেউ হয় মারা গেছে, নয়তো গ্রেপ্তার হয়েছে।

After protests crushed, Iranian tells ToI many still hoping for US, Israel  'savior' | The Times of Israel

রাস্তায় কার্যত সামরিক অবস্থা
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং পুলিশ যৌথভাবে শহরজুড়ে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। চেকপোস্টে গাড়ি থামানো হচ্ছে, মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এক সময় যেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল, সেখানে এখন নীরবতা আর আতঙ্ক। এক বাসিন্দা বলেন, মনে হয় সবাইকে হঠাৎ বাতাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগের সেই আগুন আর নেই।

ভাঙা মনোবল আর নিঃশব্দ শোক
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশের ভেতরের বাস্তবতা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অল্প সময়ের জন্য সংযোগ মিললে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা হলো হতাশা। কারাজ শহরের এক যুবক বলেন, মানুষের মনোবল ভেঙে গেছে, সবার মুখেই সেটা দেখা যায়। দোকানপাট খুলছে পুলিশের চাপে, যেন সবকিছু স্বাভাবিক দেখানো যায়। অথচ বাস্তবে বাজার খোলা রাখাই হচ্ছে জোর করে।

তেহরানের আরেক বাসিন্দা জানান, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলেও তা এখন নীরব শোকসভায় পরিণত হয়। দেশের ভেতরের বাস্তবতার সঙ্গে প্রবাসী সংবাদমাধ্যমে দেখানো চিত্রের বড় ফারাক তাদের আরও একা করে তুলছে। তার পরিবারের চারজন সদস্য এই আন্দোলনে নিহত হয়েছেন। তার কথায়, দেশের বাইরে যা দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে এখানে তেমন কিছুই নেই। এখানে কেবল নিরাশা।

Iran Protests: Brutal Crackdown Kills Thousands, Spreads Fear - Bloomberg

নিহত ও গ্রেপ্তারের ভয়াবহ সংখ্যা
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরের শেষ থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আরও হাজার হাজার ঘটনার যাচাই চলছে এবং কয়েক দশক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি চিকিৎসকদের অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী তা আরও অনেক বেশি হতে পারে। হাসপাতালে আহতদের অনেককেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি করা হয়নি, কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ে চিকিৎসকরাও আতঙ্কে আছেন।

অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর আঘাত
ইন্টারনেট বন্ধ এবং মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির। আগে থেকেই সংকটে থাকা অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে। এক ব্যবসায়ী নারী জানান, গত এক বছরে তার প্রতিষ্ঠানের কাজ হয়েছে মাত্র কয়েক মাসের সমান। ব্যাংকিং লেনদেন পর্যন্ত ব্যাহত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবেই প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের আয় হারাচ্ছে দেশ।

After brutal crushing of protests, Iranians stare into abyss | The Straits  Times

ক্ষমতার ভাষ্য ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল না; বিদেশি শক্তির উসকানিতে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ঐক্যমত নেই। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছেন, কেউ আবার আরও বড় সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর কথায়, যদি কিছু না বদলায়, এই চক্র চলতেই থাকবে।