০৯:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
আমেরিকার শক্তির অবসান নাকি নতুন বাস্তবতার শুরু দেশের স্বার্থ রক্ষা না হলে মার্কিন চুক্তির ধারা পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে ডিমের বাজারে অস্থিরতা, এক মাসে ডজনে বেড়েছে ৪০ টাকা ইরানের সঙ্গে আমেরিকার দ্বন্দ্ব: শক্তির সীমা নাকি কৌশলের ব্যর্থতা? কদমতলীর সাদ্দাম মার্কেটে ভয়াবহ আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট সাত সন্তান একসঙ্গে জন্ম, কিন্তু বাঁচল না কেউ: নড়াইলে শোকের ছায়া তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের দৌড়ে বিজয়, গভর্নরের কাছে ১১৮ বিধায়কের সমর্থনের দাবি মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, বর্ষায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা হরমুজ সংকটে ভারতের এলপিজি আমদানি অর্ধেকে, সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা এআই কি মানবসভ্যতার জন্য নতুন হুমকি? মো গাওদাতের সতর্কবার্তায় গভীর উদ্বেগ

ভারতীয় চিংড়ি শিল্পে ধস, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে অচল বাজার

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্ধ্রপ্রদেশের ভীমাভারমে চোখ যত দূর যায়, বিস্তৃত চিংড়ির ঘের। এক সময় এই ঘেরগুলোই ছিল সমৃদ্ধির প্রতীক। আজ সেখানে উৎকণ্ঠার ছায়া। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কে চিংড়ির দাম হঠাৎ প্রায় অর্ধেকের বেশি বেড়ে যাওয়ায় ভারতের চিংড়ি শিল্প ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। উৎপাদক, রপ্তানিকারক ও শ্রমিক সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায়।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে উৎপাদন স্থবির
ভীমাভারমের যেসব কারখানায় একসময় দিনরাত চিংড়ি পরিষ্কার, প্রক্রিয়াজাত ও হিমায়িত করার কাজ চলত, সেখানে এখন নীরবতা। অধিকাংশ যন্ত্র ও ফ্রিজ বন্ধ। গত তিন মাস ধরে অর্ধেক সক্ষমতায় কাজ চলছে বলে জানান বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আনন্দা গ্রুপের পরিচালক আনন্দ কুমার উদ্দারাজু। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর থেকেই অর্ডার দ্রুত কমতে শুরু করেছে।

ভারত বছরে প্রায় এগারো লক্ষ টন চিংড়ি উৎপাদন করে, যার বড় অংশ রপ্তানি হয়। ইকুয়েডরের পর ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিংড়ি উৎপাদক। ভারতের সামুদ্রিক রপ্তানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে চিংড়ি থেকে। অন্ধ্রপ্রদেশ একাই দেশের চিংড়ি উৎপাদনের বড় অংশ জোগান দেয়, যার প্রায় ষাট শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

Indian shrimp industry sails in troubled waters after Trump tariffs |  Reuters

ভীমাভারমের উত্থান ও সংকট
এই ছোট শহরের বহুতল ভবন, আন্তর্জাতিক স্কুল, প্রকৌশল কলেজ, বড় গাড়ির শোরুম ও বিপণিবিতান—সবকিছুর পেছনেই ছিল চিংড়ি রপ্তানির সাফল্য। এখন সেই অর্থনীতিই দোদুল্যমান। যুক্তরাষ্ট্রই ভারতের সবচেয়ে বড় হিমায়িত চিংড়ির বাজার। গত অর্থবছরে ভারত বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের চিংড়ি রপ্তানি করেছে, যার প্রায় অর্ধেক কিনেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা ও শুল্কের ধাক্কা
দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী ভারত চিংড়ি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করেছে। বিশেষ জাতের চিংড়ি, বিশেষ কাট ও প্যাকেজিং—সবই ছিল মার্কিন বাজারকেন্দ্রিক। কিন্তু গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিতে ভারতীয় পণ্যের ওপর একের পর এক কর বসানো হয়। এর ফলে কার্যত শুল্কের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় আটান্ন শতাংশে। ফলাফল হিসেবে মার্কিন অর্ডার দ্রুত কমছে। গত বছরের অক্টোবরে রপ্তানি কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

Facing Trump tariffs, India's shrimp farmers consider switching to other  businesses | Reuters

রপ্তানিকারকদের টিকে থাকার চেষ্টা
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক রপ্তানিকারক উচ্চমূল্যের প্রক্রিয়াজাত চিংড়ির দিকে ঝুঁকছেন। মূল্য বাড়লেও মোট পরিমাণ কমে যাওয়ায় চাপ কমেনি। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চমূল্যের পণ্যে কিছু প্রবৃদ্ধি এলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

নতুন বাজার, সীমিত সম্ভাবনা
চীন, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশের চেষ্টা জোরদার হয়েছে। ইউরোপে প্রক্রিয়াজাত চিংড়ির রপ্তানি বেড়েছে, চীন ও ভিয়েতনামেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে উৎপাদকদের মতে, এসব বাজারে নানা অশুল্ক বাধা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও কম দাম বড় সমস্যা। ইউরোপে কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চীনে ভিন্ন ধরনের চাহিদা—সব মিলিয়ে সম্ভাবনা সীমিত।

Net profits, human costs:

খামারিদের ভবিষ্যৎ শঙ্কা
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছেন চাষিরা। মার্চে নতুন মৌসুমের চিংড়ি উঠলে রপ্তানিকারকরা ন্যায্য দাম দেবেন কি না, তা নিয়ে ভয়। অনেকের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচও উঠবে না। কেউ কেউ দ্বিতীয় মৌসুমে চাষ বন্ধ রাখার কথাও ভাবছেন। রোগ ও আবহাওয়ার ঝুঁকির পাশাপাশি এই শুল্ককে তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনা করছেন।

Seafood Media Group - Worldnews - Seafood industry stares at slump as  global market for shrimp shrinks

চুক্তির আশায় প্রার্থনা
সারা শিল্প এখন তাকিয়ে আছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্য সমঝোতার দিকে। শুল্ক কমলে বা প্রত্যাহার হলে স্বস্তি ফিরতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দেশটির মোট চাহিদার সামান্য অংশই মেটাতে পারে। তবু সমাধান না এলে দুই হাজার ছাব্বিশ সাল থেকেই প্রকৃত সংকট শুরু হবে বলে আশঙ্কা সবার।

জনপ্রিয় সংবাদ

আমেরিকার শক্তির অবসান নাকি নতুন বাস্তবতার শুরু

ভারতীয় চিংড়ি শিল্পে ধস, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে অচল বাজার

০৩:০১:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্ধ্রপ্রদেশের ভীমাভারমে চোখ যত দূর যায়, বিস্তৃত চিংড়ির ঘের। এক সময় এই ঘেরগুলোই ছিল সমৃদ্ধির প্রতীক। আজ সেখানে উৎকণ্ঠার ছায়া। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কে চিংড়ির দাম হঠাৎ প্রায় অর্ধেকের বেশি বেড়ে যাওয়ায় ভারতের চিংড়ি শিল্প ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। উৎপাদক, রপ্তানিকারক ও শ্রমিক সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায়।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে উৎপাদন স্থবির
ভীমাভারমের যেসব কারখানায় একসময় দিনরাত চিংড়ি পরিষ্কার, প্রক্রিয়াজাত ও হিমায়িত করার কাজ চলত, সেখানে এখন নীরবতা। অধিকাংশ যন্ত্র ও ফ্রিজ বন্ধ। গত তিন মাস ধরে অর্ধেক সক্ষমতায় কাজ চলছে বলে জানান বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আনন্দা গ্রুপের পরিচালক আনন্দ কুমার উদ্দারাজু। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর থেকেই অর্ডার দ্রুত কমতে শুরু করেছে।

ভারত বছরে প্রায় এগারো লক্ষ টন চিংড়ি উৎপাদন করে, যার বড় অংশ রপ্তানি হয়। ইকুয়েডরের পর ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিংড়ি উৎপাদক। ভারতের সামুদ্রিক রপ্তানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে চিংড়ি থেকে। অন্ধ্রপ্রদেশ একাই দেশের চিংড়ি উৎপাদনের বড় অংশ জোগান দেয়, যার প্রায় ষাট শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

Indian shrimp industry sails in troubled waters after Trump tariffs |  Reuters

ভীমাভারমের উত্থান ও সংকট
এই ছোট শহরের বহুতল ভবন, আন্তর্জাতিক স্কুল, প্রকৌশল কলেজ, বড় গাড়ির শোরুম ও বিপণিবিতান—সবকিছুর পেছনেই ছিল চিংড়ি রপ্তানির সাফল্য। এখন সেই অর্থনীতিই দোদুল্যমান। যুক্তরাষ্ট্রই ভারতের সবচেয়ে বড় হিমায়িত চিংড়ির বাজার। গত অর্থবছরে ভারত বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের চিংড়ি রপ্তানি করেছে, যার প্রায় অর্ধেক কিনেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা ও শুল্কের ধাক্কা
দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী ভারত চিংড়ি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করেছে। বিশেষ জাতের চিংড়ি, বিশেষ কাট ও প্যাকেজিং—সবই ছিল মার্কিন বাজারকেন্দ্রিক। কিন্তু গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিতে ভারতীয় পণ্যের ওপর একের পর এক কর বসানো হয়। এর ফলে কার্যত শুল্কের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় আটান্ন শতাংশে। ফলাফল হিসেবে মার্কিন অর্ডার দ্রুত কমছে। গত বছরের অক্টোবরে রপ্তানি কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

Facing Trump tariffs, India's shrimp farmers consider switching to other  businesses | Reuters

রপ্তানিকারকদের টিকে থাকার চেষ্টা
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক রপ্তানিকারক উচ্চমূল্যের প্রক্রিয়াজাত চিংড়ির দিকে ঝুঁকছেন। মূল্য বাড়লেও মোট পরিমাণ কমে যাওয়ায় চাপ কমেনি। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চমূল্যের পণ্যে কিছু প্রবৃদ্ধি এলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

নতুন বাজার, সীমিত সম্ভাবনা
চীন, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশের চেষ্টা জোরদার হয়েছে। ইউরোপে প্রক্রিয়াজাত চিংড়ির রপ্তানি বেড়েছে, চীন ও ভিয়েতনামেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে উৎপাদকদের মতে, এসব বাজারে নানা অশুল্ক বাধা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও কম দাম বড় সমস্যা। ইউরোপে কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চীনে ভিন্ন ধরনের চাহিদা—সব মিলিয়ে সম্ভাবনা সীমিত।

Net profits, human costs:

খামারিদের ভবিষ্যৎ শঙ্কা
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছেন চাষিরা। মার্চে নতুন মৌসুমের চিংড়ি উঠলে রপ্তানিকারকরা ন্যায্য দাম দেবেন কি না, তা নিয়ে ভয়। অনেকের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচও উঠবে না। কেউ কেউ দ্বিতীয় মৌসুমে চাষ বন্ধ রাখার কথাও ভাবছেন। রোগ ও আবহাওয়ার ঝুঁকির পাশাপাশি এই শুল্ককে তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনা করছেন।

Seafood Media Group - Worldnews - Seafood industry stares at slump as  global market for shrimp shrinks

চুক্তির আশায় প্রার্থনা
সারা শিল্প এখন তাকিয়ে আছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্য সমঝোতার দিকে। শুল্ক কমলে বা প্রত্যাহার হলে স্বস্তি ফিরতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দেশটির মোট চাহিদার সামান্য অংশই মেটাতে পারে। তবু সমাধান না এলে দুই হাজার ছাব্বিশ সাল থেকেই প্রকৃত সংকট শুরু হবে বলে আশঙ্কা সবার।