মহান সাংবাদিকদের সম্পর্কে বলা হয়, একটি জীবদ্দশায় তারা এত ইতিহাসের সাক্ষী হন এবং ধীরে ধীরে সেই ইতিহাসেরই অংশ হয়ে ওঠেন, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। স্যার মার্ক টালির ক্ষেত্রে এই কথাটি নিঃসন্দেহে সত্য। কলকাতায় জন্ম নেওয়া মার্ক টালি ১৯৭২ সালে দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো প্রধান নিযুক্ত হন এবং জীবনের বাকি সময়টা ভারতকেই নিজের ঘর করে নেন। আধুনিক দক্ষিণ এশিয়াকে বোঝার জন্য প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই তিনি প্রত্যক্ষভাবে সংবাদে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জরুরি অবস্থা, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন, ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড বিপর্যয়, অপারেশন ব্লু স্টার, দিল্লির দাঙ্গা, বাবরি মসজিদ ধ্বংস—এমন অসংখ্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত তার প্রতিবেদনের অংশ হয়ে আছে।
তবে সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্যার মার্ক টালি শুধু দীর্ঘদিন ভারতে কাজ করার জন্যই অনন্য নন। তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র, কারণ বহু সময়ে তার কণ্ঠই ছিল ইতিহাসের একমাত্র তাৎক্ষণিক খসড়া। ভদ্র প্রজ্ঞা, সংযত ভাষা, নৈতিক দৃঢ়তা, সূক্ষ্ম রসবোধ এবং মানবিক সীমার মধ্যে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষতা—এসব গুণ নিয়ে তিনি সংবাদ পরিবেশন করতেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, বহু সংকটময় মুহূর্তে যা ঘটছে, তা বোঝার জন্য তার কণ্ঠস্বর ছাড়া আর কোনো ভরসাযোগ্য উৎস ছিল না।

এক সময় মজা করে বলা হতো, প্রতিটি ভারতীয়র মধ্যেই একটি করে ‘মার্ক টালি স্মৃতি’ আছে। আমার নিজের স্মৃতি ফিরে যায় স্কুলজীবনে, ১৯৮৪ সালের দিল্লি দাঙ্গার সময়ে। জয়পুরের মতো শহরে তখন নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর দিল্লিতে শিখদের ওপর হামলার ভয়াবহ টুকরো টুকরো খবর ভেসে আসত, কিন্তু সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট ছিল না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় কেবল মার্ক টালির কণ্ঠই নিয়ন্ত্রিত হতাশার সঙ্গে যা ঘটছিল তার একটি সুসংহত রূপ তুলে ধরত। তার নরম, ছন্দময় উচ্চারণ আশ্চর্যজনকভাবে বর্ণিত ভয়াবহতাকে আরও জীবন্ত করে তুলত। সেই অন্ধকার সন্ধ্যাগুলোতে মনে হতো, ইতিহাস যেন কেবল তার কণ্ঠেই কথা বলছে।
মার্কের ব্যক্তিগত গুণাবলির পাশাপাশি সেই সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটিও মনে রাখা জরুরি, যা তাকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। ভারতে বিদেশি সংবাদমাধ্যম বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ আমাদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম অনেক সময়ই সেন্সরশিপ বা নানা সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত ছিল। কার্যত বিবিসিকেই স্থানীয় রেডিওর ভূমিকা পালন করতে হতো, কারণ তখন ভারতের এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। একই সঙ্গে বিবিসি তখন সত্যিই একটি মহান প্রতিষ্ঠান ছিল। তাদের পক্ষপাত ও অন্ধকার দিক ছিল বটে, কিন্তু মার্কের মতো সাংবাদিকদের কারণেই তারা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিল। তার কোনো বিশ্লেষণের সঙ্গে মাঝে মাঝে দ্বিমত হতে পারত, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার প্রতি আস্থা কখনোই নষ্ট হয়নি।

২০০৪ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে মার্ক আমার সঙ্গে একটি রেডিও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাতের দুটি বিষয় আজও মনে গেঁথে আছে। অপেক্ষার সময় তাকে সহায়তা করা এক তরুণ ইন্টার্ন সাংবাদিকতা নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশ্ন করছিল। এক পর্যায়ে মার্ক বলেছিলেন, সাংবাদিকতার একটাই নিয়ম আছে—নিজেকে জিজ্ঞেস করো, দীর্ঘমেয়াদে মানুষ কেন তোমাকে বিশ্বাস করবে। এই প্রশ্নটি মনে রাখলে সংবাদ পরিবেশনের শৃঙ্খলা আপনাতেই চলে আসে। একবার বিশ্বাস ক্ষয়ে গেলে তা আর কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না। আর এই ক্ষয় যেমন ক্ষমতার নৈকট্যে হতে পারে, তেমনি জনপ্রিয়তা ও অর্থের লোভেও হতে পারে। পরবর্তী বছরগুলোতে মার্ক বিবিসির অবক্ষয়ের কড়া সমালোচক হয়ে ওঠেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, সেখানে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে এক অদ্ভুত স্তালিনবাদী মানসিকতা এবং একই সঙ্গে স্থূল বাণিজ্যিকতার মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে।
আরেকটি বিষয় ছিল তার সমাজতাত্ত্বিক দূরদর্শিতা, যা এসেছে দীর্ঘদিনের কঠোর প্রতিবেদনের অভিজ্ঞতা থেকে। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজনীতি এক গভীর রূপান্তরের মুখে দাঁড়িয়ে। এটি এই কারণে নয় যে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারবে না। আমরা দুজনেই একমত ছিলাম যে এই শব্দটি প্রায়ই ব্যাখ্যার চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি সৃষ্টি করে। বরং তিনি অনুভব করেছিলেন, এক ধরনের আন্তরিকতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সমাজে দানা বাঁধছে, যা ভারতের অভিজাত শ্রেণি উপেক্ষা করছে। এই ভাবনাই তিনি বারবার তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে ‘নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে।

মার্ক টালির আরেকটি বিরল বৈশিষ্ট্য ছিল, প্রতিটি রাজনৈতিক শাসনামলেই তিনি সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। জরুরি অবস্থার সময় তাকে ভারত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সতীশ জ্যাকবের সঙ্গে লেখা তার গ্রন্থ ‘অমৃতসর: মিসেস গান্ধীর শেষ যুদ্ধ’ পরবর্তী গবেষণায় কিছু অংশে ছাপিয়ে গেলেও আজও তা এক অপরিহার্য সূচনা বিন্দু। কারণ এটি সাহসের সঙ্গে দুটি প্রশ্ন তুলেছিল, যা দীর্ঘদিন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল—শিখ অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল চক্রান্ত এবং অপারেশন ব্লু স্টার ও তার পরবর্তী ট্র্যাজেডি সৃষ্টিতে কংগ্রেস দলের ভূমিকা। অযোধ্যাকে ঘিরে সহিংসতার সময় কেবল সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করার জন্যই তাকে ঘিরে ধাওয়া করা হয়েছিল এবং জনতা চিৎকার করেছিল, ‘মার্ক টালির মৃত্যু চাই’।
মার্ক ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, যিনি পেশার বহু প্রচলিত প্রলোভনে কখনোই আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি ভারত ও তার চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে বুঝতেন, কিন্তু তার সমালোচনায় কখনোই মানুষের প্রতি ঘৃণা ছিল না। তিনি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের যোদ্ধা হয়ে ওঠেননি এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠতাকে গুলিয়ে ফেলেননি। মার্ক প্রায়ই বলতেন, ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে তিনি এক ধরনের নিয়তির অনুভূতি খুঁজে পান। তার মধ্যে ছিল গভীর কৃতজ্ঞতা, জীবনের উপহারস্বরূপ অনুভব করার ক্ষমতা। তিনি ছিলেন গভীরভাবে অ্যাংলিকান খ্রিস্টান, তবু একবার তাকে বলতে শুনেছিলাম, খ্রিস্টধর্মে আদি পাপের ওপর কম জোর দিয়ে ‘নিয়তি’র অনুভূতিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। তার কাছে নিয়তি মানে ছিল না নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণ। বরং সব সমস্যার মধ্যেও এই পৃথিবী একটি উপহার—এই স্বীকৃতিই ছিল তার নিয়তির ধারণা। ভারত এবং ভারতকে নিয়ে সংবাদ করার দায়িত্ব ছিল এমন এক উপহার, যা তিনি অন্য যে কারও চেয়ে গভীরভাবে গ্রহণ করেছিলেন।

প্রতাপ ভানু মেহতা 



















