১২:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠক, সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে ফ্রান্স কঠোর নিরাপত্তার মাঝেও তারেক রহমানের জনসভার আগের রাতে ১৮ মাইক ও পাঁচ কয়েল তার চুরি হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার মন্তব্য কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পররাষ্ট্র নীতির লঙ্ঘন জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের দিন ও আগের সহিংসতার দায় নিতে হবে আওয়ামী লীগকে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সতর্কতা ৩০০ বছরের ঐতিহ্যে দয়াময়ী মেলা, ভক্তি ও আনন্দের মিলনস্থল ময়মনসিংহে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ২০ সাদ্দামের প্যারোল না দেওয়ার ঘটনায় মানবিকতার প্রশ্ন, আইনের সীমা ও রাষ্ট্রের দায় যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ চট্টগ্রামে বিএনপির সমাবেশে যাওয়ার পথে ছাত্রদল কর্মীর মৃত্যু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে খেলায় কান ধরানো ভাইরাল ভিডিও ঘিরে সমালোচনা

এক জন আবু সাইয়িদের দল বদলের ইতিহাস

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু চরিত্র আছেন, যাঁদের পথচলা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাঁকবদলেরও নীরব দলিল। আবু সাইয়িদ তেমনই এক নাম। স্বাধীনতার আগে থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সংকটকাল—প্রায় প্রতিটি পর্বেই তিনি কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির কেন্দ্র বা প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন। আর সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে বারবার বদলেছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, বদলেছে দলীয় পরিচয়।

স্বাধীনতার আগের আবু সাইয়িদ

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আবু সাইয়িদের। সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। পরবর্তীতে তিনি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হন, যা তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ার একেবারে ভেতরের বৃত্তে নিয়ে আসে। এই অধ্যায় তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রজন্মের একজন প্রত্যক্ষ অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত করে।

আওয়ামী লীগ ও রাষ্ট্রক্ষমতার সময়

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথমবার পাবনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবু সাইয়িদ। পরে ১৯৯৬ সালেও একই আসন থেকে সংসদে যান তিনি। এই সময়গুলোতে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক পর্যায়ে তিনি তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এই সময়টাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী অধ্যায়।

রাজনীতি : বিএনপিতে যোগ দেয়া আবু সাইয়িদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন

বাকশাল থেকে বিরোধী পথে

১৯৯১ সালের নির্বাচনে আবু সাইয়িদ দাঁড়ান বাকশালের প্রার্থী হিসেবে। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রথম বড় পরিবর্তন, যা তখনকার রাজনীতিতে ভিন্ন বার্তা দেয়। যদিও সেই নির্বাচনে তিনি জয় পাননি, তবু দল বদলের এই ধারা এখান থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কিন্তু সেবারও পরাজয়ের মুখ দেখতে হয় তাঁকে। এক এগারোর পরের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে তিনি আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলেন এবং সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান। তবে এই পরিচিতিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে দলীয় নেতৃত্বের বাইরে ঠেলে দেয়।

স্বতন্ত্র ও গণফোরাম অধ্যায়

২০১৪ সালের নির্বাচনে আবু সাইয়িদ নামেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এটি ছিল মূলধারার দলীয় রাজনীতি থেকে তাঁর এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত। এরপর ২০১৮ সালে তিনি যোগ দেন গণফোরামে এবং সেই দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু এখানেও সাফল্য ধরা দেয়নি।

এই সময়ের আবু সাইয়িদকে অনেকেই দেখেছেন একজন অভিজ্ঞ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়া নেতা হিসেবে, যিনি বারবার নতুন আশ্রয় খুঁজছেন।

বিএনপিতে যোগ ও সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে আবার বড় মোড় নেয় তাঁর রাজনৈতিক পথচলা। ২১ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। কিছুদিন আগেও পাবনা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামা আবু সাইয়িদ শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণা দেন।

তিনি এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা এবং বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির চেয়ে স্বাধীনতার পক্ষে শক্তিকে একত্র করাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতির আয়নায় আবু সাইয়িদ

আবু সাইয়িদের দল বদলের ইতিহাস আসলে কেবল একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ সংকট, আদর্শিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার বাস্তবতার প্রতিফলন। কেউ একে দেখেন রাজনৈতিক অভিযোজন হিসেবে, কেউ বলেন আদর্শগত অস্পষ্টতা। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, আবু সাইয়িদের রাজনৈতিক জীবন মানেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা।

একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ, বাকশাল, স্বতন্ত্র, গণফোরাম এবং সর্বশেষ বিএনপি—এই দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতিরই এক জীবন্ত ক্রনিকল, যেখানে ব্যক্তি ও সময় একে অপরকে বারবার নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠক, সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে ফ্রান্স

এক জন আবু সাইয়িদের দল বদলের ইতিহাস

১০:৫৭:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু চরিত্র আছেন, যাঁদের পথচলা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাঁকবদলেরও নীরব দলিল। আবু সাইয়িদ তেমনই এক নাম। স্বাধীনতার আগে থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সংকটকাল—প্রায় প্রতিটি পর্বেই তিনি কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির কেন্দ্র বা প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন। আর সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে বারবার বদলেছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, বদলেছে দলীয় পরিচয়।

স্বাধীনতার আগের আবু সাইয়িদ

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আবু সাইয়িদের। সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। পরবর্তীতে তিনি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হন, যা তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ার একেবারে ভেতরের বৃত্তে নিয়ে আসে। এই অধ্যায় তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রজন্মের একজন প্রত্যক্ষ অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত করে।

আওয়ামী লীগ ও রাষ্ট্রক্ষমতার সময়

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথমবার পাবনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবু সাইয়িদ। পরে ১৯৯৬ সালেও একই আসন থেকে সংসদে যান তিনি। এই সময়গুলোতে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক পর্যায়ে তিনি তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এই সময়টাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী অধ্যায়।

রাজনীতি : বিএনপিতে যোগ দেয়া আবু সাইয়িদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন

বাকশাল থেকে বিরোধী পথে

১৯৯১ সালের নির্বাচনে আবু সাইয়িদ দাঁড়ান বাকশালের প্রার্থী হিসেবে। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রথম বড় পরিবর্তন, যা তখনকার রাজনীতিতে ভিন্ন বার্তা দেয়। যদিও সেই নির্বাচনে তিনি জয় পাননি, তবু দল বদলের এই ধারা এখান থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কিন্তু সেবারও পরাজয়ের মুখ দেখতে হয় তাঁকে। এক এগারোর পরের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে তিনি আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলেন এবং সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান। তবে এই পরিচিতিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে দলীয় নেতৃত্বের বাইরে ঠেলে দেয়।

স্বতন্ত্র ও গণফোরাম অধ্যায়

২০১৪ সালের নির্বাচনে আবু সাইয়িদ নামেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এটি ছিল মূলধারার দলীয় রাজনীতি থেকে তাঁর এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত। এরপর ২০১৮ সালে তিনি যোগ দেন গণফোরামে এবং সেই দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু এখানেও সাফল্য ধরা দেয়নি।

এই সময়ের আবু সাইয়িদকে অনেকেই দেখেছেন একজন অভিজ্ঞ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়া নেতা হিসেবে, যিনি বারবার নতুন আশ্রয় খুঁজছেন।

বিএনপিতে যোগ ও সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে আবার বড় মোড় নেয় তাঁর রাজনৈতিক পথচলা। ২১ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। কিছুদিন আগেও পাবনা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামা আবু সাইয়িদ শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণা দেন।

তিনি এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা এবং বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির চেয়ে স্বাধীনতার পক্ষে শক্তিকে একত্র করাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতির আয়নায় আবু সাইয়িদ

আবু সাইয়িদের দল বদলের ইতিহাস আসলে কেবল একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ সংকট, আদর্শিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার বাস্তবতার প্রতিফলন। কেউ একে দেখেন রাজনৈতিক অভিযোজন হিসেবে, কেউ বলেন আদর্শগত অস্পষ্টতা। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, আবু সাইয়িদের রাজনৈতিক জীবন মানেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা।

একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ, বাকশাল, স্বতন্ত্র, গণফোরাম এবং সর্বশেষ বিএনপি—এই দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতিরই এক জীবন্ত ক্রনিকল, যেখানে ব্যক্তি ও সময় একে অপরকে বারবার নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।