গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাকশিল্পের প্রাণকেন্দ্রগুলো আজ গভীর সংকটে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রয়াদেশ হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতের চাপের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে গত দেড় বছরে এই তিন অঞ্চলে ৩২৭টি কারখানা স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর সরাসরি অভিঘাতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী। কাজ হারানোর এই ঢেউ শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতেও দীর্ঘ ছায়া ফেলছে।
কারখানা বন্ধের বাস্তব চিত্র
গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ির নীলনগরে অবস্থিত শতভাগ রপ্তানিমুখী মুকুল নিটওয়্যার লিমিটেড একসময় তিন হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মস্থল ছিল। বৈশ্বিক মন্দা ও ক্রয়াদেশ সংকটে উৎপাদন কমে এলেও সীমিত শ্রমিক নিয়ে কারখানাটি চালু রাখার চেষ্টা করেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা মো. মইনুল ইসলাম মুকুল। শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক চাপ সামাল দিতে না পেরে গত ১৭ ডিসেম্বর কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে একদিনেই ২৮০ জন পুরুষ ও ৩৯০ জন নারী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। সংসার চালানো নিয়ে তাঁদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজীপুরে ১৮৮টি কারখানা স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে এক লাখ ১৫ হাজার ৩৭৯ জন শ্রমিক বেকার হয়েছেন। শুধু স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানাগুলোতেই চাকরি হারিয়েছেন ৯০ হাজার ৭৬০ জন শ্রমিক-কর্মচারী। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার তালিকায় রয়েছে বেক্সিমকোর ১৩টি প্রতিষ্ঠানসহ ডার্ড কম্পোজিট, সিজন ড্রেসেস, পলিকন লিমিটেড, টেক্সটাইল ফ্যাশন, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, ক্লাসিক ফ্যাশন, লা-মুনি অ্যাপারেলস, নাসা গ্রুপের লিজ ফ্যাশন, স্বাধীন গার্মেন্ট ও মিকফিফ অ্যাপারেলসের মতো পরিচিত প্রতিষ্ঠান।

শ্রমিক জীবনে ধস
স্থানীয় সূত্র জানায়, বেকার হয়ে পড়া শ্রমিকদের প্রায় ৯০ শতাংশ এখনো স্থায়ী কাজ পাননি। অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ দিনমজুরির কাজ করছেন, আবার কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। এর প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশে। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর বন্ধ হওয়া লিজ অ্যাপারেলসের সিনিয়র সুপারভাইজার মো. রুস্তম আলী জানান, নির্দিষ্ট সময়ে ব্যাংকে বেতন পাওয়া ও ভালো কাজের পরিবেশের সেই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সংসার চালানোই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
স্থানীয় অর্থনীতিতে চাপ
কারখানা বন্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাড়িভাড়া ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে। গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকার বাড়িওয়ালা মো. ইদ্রিস মোল্লা বলেন, একসময় বেক্সিমকোর হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারসহ এখানে বাস করতেন। তাঁদের ওপর নির্ভর করে বাজার, দোকান ও নানা ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। এখন শ্রমিকরা গ্রামে ফিরে যাওয়ায় ঘরবাড়ি ও দোকান ফাঁকা পড়ে আছে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি করা মালিকরা ভাড়াটিয়া না পেয়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শ্রমিক সংগঠনের উদ্বেগ
জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, একের পর এক কারখানা বন্ধ হলেও নতুন কারখানা গড়ে উঠছে না। চালু কারখানাগুলোতেও নিয়মিত শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। ফলে গাজীপুরের শ্রমিক পল্লীগুলোতে ভয়াবহ দুঃসময় নেমে এসেছে।
শিল্প পুলিশের ব্যাখ্যা
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত কয়েক মাসে জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাজের অভাব, কার্যাদেশ বাতিল ও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসা ও আবাসন খাতে।
সাভার–আশুলিয়ায় নীরব শিল্পাঞ্চল
একই চিত্র সাভার ও আশুলিয়ায়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে এখানে ১৩৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭টি স্থায়ী এবং ৭২টি অস্থায়ীভাবে বন্ধ। প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানার মধ্যে রয়েছে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন, দ্য ড্রেসেস অ্যান্ড দ্য আইডিয়াস, বসুন্ধরা গার্মেন্টস, চেইন অ্যাপারেলস, নাসা গ্রুপ, সাউথ চায়না গ্রুপ ও ইথিক্যাল গার্মেন্টস। অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে সিঙ্গার রেফ্রিজারেটর, সিঙ্গার ইলেকট্রনিকস, এফআরএম ফ্যাশন হাউস ও হিলটন অ্যাপারেলসসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।

মানবিক সংকটের গল্প
নাসা গ্রুপের সাবেক শ্রমিক আলেয়া আক্তার চার মাস ধরে বেকার। কাজের সন্ধানে ঘুরেও কোথাও সুযোগ পাচ্ছেন না। এক বেলা খেয়ে অন্য বেলা না খেয়ে দিন কাটছে তাঁর। স্বামী অনিয়মিতভাবে রিকশা চালানো বা রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করলেও তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অস্থিরতার আশঙ্কা
দীর্ঘদিন কাজ না পেয়ে অনেক শ্রমিক অপরাধের পথে জড়াচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে সামাজিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে। আশুলিয়ার জামগড়ার বাড়িওয়ালারা জানান, একসময় যেসব ঘরে কখনো শূন্যতা ছিল না, এখন সেগুলো খালি পড়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















