স্পেন উপকূলের আন্তর্জাতিক জলসীমায় জানুয়ারির এক সকালে হঠাৎ আকাশে ভেসে ওঠে সামরিক হেলিকপ্টার। নৌসেনারা নেমে আসে একটি ট্যাংকারে, তল্লাশি চালিয়ে জাহাজটিকে ঘুরিয়ে দেয় ফরাসি বন্দরের দিকে। ভুয়া পতাকা ও নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল বোঝাই সেই জাহাজটি এখন কড়া পাহারায় নোঙর করা। এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘদিন ধরে ছায়ায় চলা রাশিয়ার তেল পরিবহনের গোপন নৌবহর আর নিরাপদ নেই।
গোপন নৌবহরের বিস্তার ও কৌশল
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য যে নৌবহর গড়ে উঠেছে, তার জন্ম এক দশক আগে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী হয়ে ওঠে। পুরোনো জাহাজ, ভুয়া মালিকানা, বারবার নাম বদল, অবস্থান লুকোনো আর খোলা সমুদ্রে তেল বদল—এই সব কৌশলেই চলছিল তাদের ব্যবসা। একসময় প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল এই পথেই পৌঁছাত এশিয়ার বাজারে।
নিষেধাজ্ঞার নতুন ঢেউ
কিন্তু পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো এখন মধ্যস্বত্বভোগী নয়, সরাসরি ট্যাংকারকেই লক্ষ্য করছে। এক বছরে শত শত জাহাজ কালো তালিকায় উঠেছে। এর মানে বিমা নেই, ব্যাংকিং সুবিধা নেই, আন্তর্জাতিক সনদও মিলছে না। ইউরোপে রাশিয়ার তেল থেকে তৈরি পণ্যের আমদানি বন্ধ হওয়ায় তৃতীয় দেশের পথও সংকুচিত হয়েছে। সামনে আরও কড়াকড়ির ইঙ্গিত রয়েছে।
পতাকা সংকট ও জাহাজ জব্দ
আন্তর্জাতিক নিয়মে জাহাজের বৈধ পতাকা থাকা বাধ্যতামূলক। আগে কিছু দেশ সহজে পতাকা দিত, কিন্তু চাপ বাড়তেই তারা তালিকা পরিষ্কার করতে শুরু করে। ফলে অনেক ট্যাংকার এক পতাকা থেকে আরেক পতাকায় লাফাতে থাকে। কোথাও কোথাও জাল সনদ ব্যবহার করা হয়। আইনগতভাবে এসব জাহাজ তখন রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী তল্লাশি ও জব্দ করছে।
ড্রোন ও সামরিক চাপ
ইউক্রেনও নীরব নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোন ও নৌমাইন ব্যবহার করে দূর সমুদ্রে ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। এতে শুধু ক্ষতিই নয়, বিমা খরচ আর পরিবহন ব্যয় লাফিয়ে বেড়েছে। ফলাফল হিসেবে রাশিয়ার প্রধান তেলের দাম আন্তর্জাতিক দামের তুলনায় বড় ছাড়ে বিকোচ্ছে। এই চাপ অব্যাহত থাকলে রাশিয়ার মাসিক জ্বালানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
রাশিয়ার পাল্টা কৌশল
বাজারে পৌঁছানোর পথ বাঁচাতে রাশিয়া এখন আরও বেশি জাহাজ নিজের নিবন্ধনে আনছে। এতে নৌবহর কম ছায়াময় হলেও আরও সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে এসব জাহাজ পাহারায় যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান নামানো হতে পারে। তবে বিমা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়ে গেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
ক্রমশ বাড়তে থাকা নিষেধাজ্ঞা, পতাকা সংকট আর ড্রোন হামলার যুগে রাশিয়ার এই অন্ধকার নৌবহর কি শেষ পর্যন্ত ডুবে যাবে? আপাতত উত্তর অনিশ্চিত, তবে ঢেউ যে উল্টো দিকেই বইছে, তা স্পষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















