সন্তানের স্ক্রিন টাইম কমানো আজকের দিনে অনেক অভিভাবকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হঠাৎ করে মোবাইল বা ডিভাইস কেড়ে নেওয়া প্রায়ই সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কড়াকড়ি নয়, বরং সহমর্মিতা, স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়াই হতে পারে কার্যকর সমাধান।
একজন মায়ের অভিজ্ঞতা
একজন মা জানান, তাঁর ছেলে যখন সেকেন্ডারি ওয়ানে, অর্থাৎ প্রায় ১৩ বছর বয়সে পড়ে, তখন তিনি কোনো নিয়ন্ত্রণ বা প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ছাড়াই তাকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেন। নির্দিষ্ট সীমা না থাকায় ছেলের ফোন ব্যবহার ধীরে ধীরে বেড়ে যায়।

রাতের ঘুম পিছিয়ে যেতে থাকে, কারণ সে ঘুমের সময় পেরিয়েও বন্ধুদের বার্তার জবাব দিত। এ নিয়ে মা-ছেলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। মায়ের মনে হতো ছেলে অতিরিক্ত সময় ফোনে কাটাচ্ছে, কিন্তু ছেলের যুক্তি ছিল—তার বন্ধুরাও একই কাজ করছে, সে সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী নয়।
মা স্বীকার করেন, একবার অবাধ সুযোগ দেওয়ার পর তা সীমিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক মাস পর ছেলের পুরনো ফোনটি নষ্ট হয়ে গেলে তিনি নতুন ফোন না দিয়ে প্রায় নয় মাস তাকে মোবাইলবিহীন রাখেন।
এই সময়ে তারা ফোন ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে বহুবার কথা বলেন। কখনো আলোচনা উত্তপ্ত হয়েছে, তবু তিনি সচেতনভাবে সম্পর্কটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর কাছে যে বিষয়টি ছিল অর্থহীন চ্যাট, সন্তানের কাছে সেটিই ছিল সামাজিক যোগাযোগের অংশ।
পরবর্তীতে তারা একধরনের সমঝোতায় পৌঁছান। সেকেন্ডারি টু-তে ওঠার পর আবার ফোন দেওয়া হলে ছেলে আগের তুলনায় বেশি সচেতন হয়। তবে মা এখনও নিশ্চিত নন, সেটিই ছিল সেরা পদ্ধতি কি না।
কঠোর নিষেধাজ্ঞা নয়, অংশীদারিত্বের মনোভাব
Singapore Children’s Society-এর সিনিয়র সমাজকর্মী কেট অফিয়াজা বলেন, স্ক্রিন টাইম কমানো অনেক সময় শিশুর কাছে ক্ষমতার লড়াই বা ব্যক্তিগত ক্ষতি মনে হতে পারে। তাই হঠাৎ নিষেধাজ্ঞার বদলে ধীরে ধীরে সময় কমানো বেশি কার্যকর।

তিনি বলেন, সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে পরিবর্তনের কারণ বোঝানো জরুরি। “কেন” সীমা টানা হচ্ছে, তা বুঝলে শিশুর সহযোগিতা বাড়ে এবং বিষয়টি শাস্তির মতো মনে হয় না।
অভিভাবকদের উচিত একবারে পুরোপুরি নিষেধ না করে ধাপে ধাপে সীমা নির্ধারণ করা। পাশাপাশি খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, শখ বা পারিবারিক সময়ের মতো বিকল্প কার্যক্রম বাড়ানো দরকার।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে সন্তানকে যুক্ত করলে দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা তৈরি হয়। তবে নিয়মে ধারাবাহিকতা রাখতে হবে, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছুটা নমনীয়তাও দেখাতে হবে—যেমন স্কুল প্রজেক্ট বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের সময়।
অভিভাবকদের নিজেরাও সচেতনভাবে স্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি। কারণ, সন্তানরা প্রায়ই বড়দের আচরণ অনুসরণ করে।
বয়সভেদে আলাদা কৌশল
Institute of Mental Health-এর ডেভেলপমেন্টাল সাইকিয়াট্রি বিভাগের সিনিয়র কেস ম্যানেজার ক্রিস্টিন ট্যান বলেন, পাঁচ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে হঠাৎ বন্ধ করা সম্ভব হলেও ১৫ বছরের কিশোরের ক্ষেত্রে তা কার্যকর নয়।
ছয় বছর পর্যন্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ডিভাইস সরিয়ে নিয়ে হাতে-কলমে কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে। সাত থেকে নয় বছরের শিশুদের জন্য ভিজ্যুয়াল সময়সূচি ও পুরস্কার পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।
দশ থেকে বারো বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে ডিভাইস ব্যবহারের প্রভাব ব্যাখ্যা করা জরুরি। স্ক্রিন টাইম ট্র্যাকার ব্যবহার করে তথ্য দেখালে তারা বিষয়টি বাস্তবভাবে বুঝতে পারে।
১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে খোলামেলা সংলাপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজেদের প্রায় প্রাপ্তবয়স্ক মনে করে। তাই নিয়ন্ত্রণের বদলে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো দরকার। পরিবারের সবার জন্য একসঙ্গে লক্ষ্য নির্ধারণ করলে পরিবর্তন সহজ হয়।

সম্পর্ক রক্ষা করাই মূল চাবিকাঠি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, শাস্তি বা অপমানের পথ এড়িয়ে চলা উচিত। বরং স্ক্রিন সীমা নির্ধারণকে সন্তানের মঙ্গল ও সুস্থতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা দরকার।
সন্তান নিয়ম মেনে চললে তাকে স্বীকৃতি ও উৎসাহ দেওয়া উচিত। বাড়িতে কিছু নির্দিষ্ট সময় ও স্থান—যেমন খাবার টেবিল, পারিবারিক বেড়ানো বা শোবার ঘর—স্ক্রিনমুক্ত রাখা পারিবারিক সংযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
স্ক্রিন টাইম নিয়ে মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। তবে স্পষ্ট সীমা, সহমর্মী মনোভাব এবং খোলামেলা যোগাযোগ থাকলে অধিকাংশ পরিবারই নিজেদের জন্য উপযুক্ত একটি ভারসাম্য খুঁজে পেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















