রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের কামচাটকা উপদ্বীপে আগ্নেয়গিরি আর সবুজ বনের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে অবহেলিত এক গ্রাম সেদানকা। প্রকৃতির ঐশ্বর্যের পাশেই এখানে দারিদ্র্য, ভাঙাচোরা বাড়িঘর আর অনিশ্চিত জীবনের কষ্ট একসঙ্গে বাস করে। ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক পুরুষ অংশ নেওয়ার পর এই গ্রামকে ‘সামরিক বীরত্বের গ্রাম’ উপাধি দেওয়ার ঘোষণা এলেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
অবহেলার ভিতরে বেঁচে থাকা সেদানকা
সোভিয়েত আমলের জরাজীর্ণ ঘরবাড়ি, চুইয়ে পড়া ছাদ, দেয়ালে ছত্রাকের দাগ আর অধিকাংশ বাড়িতে পানির সংযোগ না থাকা—এসবই সেদানকার নিত্যদিনের চিত্র। নর্দমা উপচে কাঁচা রাস্তায় জল জমে থাকে। ময়লার স্তূপে খাবারের খোঁজে ঘোরে বন্যপ্রাণী। স্থানীয়দের ভাষায়, এখানে টিকে থাকাই বড় সংগ্রাম।
এমন অবস্থায় গত গ্রীষ্মে কামচাটকা প্রদেশের গভর্নর ভ্লাদিমির সলোদভ গ্রামটিকে ‘সামরিক বীরত্বের গ্রাম’ উপাধি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা শহরগুলোর জন্য তৈরি এই সম্মান প্রথমবারের মতো ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি গ্রামকে দেওয়ার ঘোষণা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
যুদ্ধে গিয়ে ফেরেনি অনেকেই
প্রায় আড়াইশ মানুষের এই গ্রাম থেকে ৬৭ জন পুরুষের মধ্যে ৩৯ জন ইউক্রেনে যুদ্ধে যান। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৯ জন নিহত বা নিখোঁজ বলে স্থানীয়দের দাবি। সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক হতাহতের হিসাব প্রকাশ না হলেও গ্রামে শোকের ছায়া স্পষ্ট।
গ্রাম পরিষদের সদস্য ও উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংগঠনের নেত্রী স্বেতলানা জাখারোভা বলেন, জাতীয়ভাবে এই গ্রামকে সামনে আনা হলে তার করুণ বাস্তবতাও প্রকাশ পাবে। তাঁর প্রশ্ন, বীরত্বের স্বীকৃতি দেখাতে গিয়ে ভাঙা বাড়ি আর নিঃস্ব মানুষের ছবি কীভাবে দেখানো হবে?
প্রতিশ্রুতি মিলল না, সহায়তাও নয়
ঘোষণার পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা মেলেনি বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। একবার জ্বালানি কাঠ দেওয়া ছাড়া আর কোনো সাহায্য আসেনি। প্রতিশ্রুত সামাজিক সহায়তা বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজও শুরু হয়নি।
যুদ্ধের টানে কেন গেলেন গ্রামবাসী
সেদানকা মূলত আদিবাসী কোরিয়াক ও ইতেলমেন জনগোষ্ঠীর আবাস। একসময় হরিণ পালন, মাছ ধরা ও সবজি চাষে সমৃদ্ধ ছিল এলাকা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর জমি ও নদীর মাছ ধরার অধিকার বেসরকারিকরণ হওয়ায় ঐতিহ্যগত জীবিকা হারায় মানুষ।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ ও মাসিক ভাতা পাওয়ার প্রলোভন অনেককে আকৃষ্ট করে। অনেকের কাছে সেটিই ছিল জীবনের মোড় ঘোরানোর সুযোগ।
ফিরে এসে বদলে যাওয়া মানুষ
যারা যুদ্ধ শেষে ফিরেছেন, তাঁদের অনেকেই মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। দিমিত্রি তুলিক নামে এক জেলে বলেন, তাঁর ভাই গুরুতর আহত অবস্থায় ফিরেছেন, যেন অর্ধেক মানুষ হয়ে।
কেউ কেউ যুদ্ধের অর্থে পাশের গ্রামে বাড়ি কিনেছেন বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছেন। তবে গ্রামটির সামগ্রিক চেহারায় বড় পরিবর্তন আসেনি। বরং অনেকেই হতাশা থেকে মদ্যপানে ডুবে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঐতিহাসিক তুলনা ও বাড়তে থাকা প্রশ্ন
রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সামরিক অভিযানের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতির তুলনা টানা হয়। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ এখন সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের সময়সীমাকেও অতিক্রম করেছে। সুস্পষ্ট সাফল্য ছাড়া দীর্ঘায়িত সংঘাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে।
স্বেতলানা জাখারোভার স্বামী আলেকসান্দর চেভভিনও স্বেচ্ছায় যুদ্ধে গিয়ে নিহত হন। পাঁচ সন্তানের মা জাখারোভা দীর্ঘ সময় সন্তানদের সত্য জানাননি। তাঁর মতো অনেক পরিবারের মনেই একই প্রশ্ন ঘুরছে—এই মৃত্যুদের অর্থ কী?
আশা ক্ষীণ, প্রশ্ন অমীমাংসিত
সেদানকায় এখন আর ‘সামরিক বীরত্বের গ্রাম’ উপাধির কথা তেমন উচ্চারিত হয় না। গ্রাম চত্বরে লেনিনের মূর্তির জায়গায় বসানো হয়েছে এক সৈনিকের ভাস্কর্য, কিন্তু তাতে ক্ষত মুছে যায়নি।
গ্রামবাসীদের কণ্ঠে একটাই প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আমাদের ছেলেরা কী জন্য প্রাণ দিল?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















