মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দেশের অন্তত চার জেলায় ধারাবাহিক গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ১৫ জন দগ্ধ হয়েছেন। নগর এলাকার আবাসিক ভবনগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তা নতুন করে সামনে এনেছে।
চট্টগ্রামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, পাঁচজনের মৃত্যু
সোমবার ভোরে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় ছয়তলা একটি ভবনের তৃতীয় তলায় গ্যাস লাইনের বিস্ফোরণে একটি পরিবারে নয়জন দগ্ধ হন। গুরুতর আহতদের মধ্যে শওকত হোসেন (৪৯), আশুরা আক্তার পাখি (৩০), নূরজাহান আক্তার, তার ছেলে শাওন এবং ভগ্নিপতি সুমন বুধবার বিকেল পর্যন্ত মারা যান।
অন্য আহতরা ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকদের মতে, দগ্ধের মাত্রা গুরুতর হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছিল।
হাজারীবাগে একই দিনে আরেক বিস্ফোরণ
একই দিনে রাজধানীর হাজারীবাগের পূর্ব রায়েরবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। আহতরা হলেন শেখ রোমান (৩৫), তার স্ত্রী পিংকি আক্তার (৩২), তিন বছরের ছেলে মায়ান এবং রোমানের ভগ্নিপতি অপু (২৩)। তারা ভবনের নিচতলায় বসবাস করতেন। ভোররাতে তাদেরও দ্রুত বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
কুমিল্লায় পরিবারে চারজন দগ্ধ
মঙ্গলবার কুমিল্লার দাউদকান্দিতে সন্দেহভাজন গ্যাস লিক থেকে সৃষ্ট আগুনে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। আহতরা হলেন মনোয়ারা (৬০), জিল হক (৩৭), উম্মে হুমায়রা (৩০) এবং দুই বছরের শিশু হুররাম। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তাদের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।
চাঁদপুরেও বিস্ফোরণ
বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায় গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে খাদিজা (৩০), মাহমুদুল (৩৫) ও শিউলি আক্তার (৪০) আহত হন। পরে তাদেরও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
সরকারের আশ্বাস ও সমন্বিত উদ্যোগ
চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার দগ্ধদের দেখতে মঙ্গলবার সকালে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে যান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা জানান, শিল্প, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ও ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শিগগিরই যৌথ বৈঠকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটি গঠন
চট্টগ্রামের হালিশহর বিস্ফোরণের ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে, যাদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পক্ষ থেকেও তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বারবার গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় নগরবাসীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গ্যাস লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সিলিন্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















