ব্রিটেনের কিছু হেজরো মিশরের পিরামিডের চেয়েও প্রাচীন। ডার্টমুরের ব্রোঞ্জ যুগের ‘রিভস’ থেকে শুরু করে আধুনিক ক্ষেতের সীমানা—আজও এগুলোই বন্যপ্রাণী, কৃষিকাজ ও গ্রামীণ ভূদৃশ্যকে গড়ে দিচ্ছে।
ডার্টমুরের পাহাড়ি পথে এক কুকুর হাঁটানো মানুষকে যখন ‘রিভস’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, এ বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই। তবে ব্রোঞ্জ যুগের বসতি খুঁজলে পাহাড়ের চূড়ায় যেতে হবে। কুয়াশা ও হালকা বৃষ্টিতে ভেজা ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে চোখে পড়ে ঘাসের সরু উঁচু রেখা, যার ফাঁকে ফাঁকে ধূসর গ্রানাইট পাথর উঁকি দিচ্ছে। প্রথমে এগুলো প্রাকৃতিক মনে হলেও পরে বোঝা যায়—এগুলো মানবসৃষ্ট। প্রায় সোজা রেখায় ছড়িয়ে থাকা এই উঁচু অংশগুলোই ‘রিভস’। ব্রোঞ্জ যুগের মানুষের হাতে গড়া এই কাঠামোই বিশ্বের প্রাচীনতম হেজের অবশেষ।
কয়েক দিন পর ফোনে কথা হয় মেগান গিম্বার্সের সঙ্গে। তিনি বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণে কাজ করেন এবং নিজেকে ‘হেজ-প্রেমী’ বলে পরিচয় দেন। তাঁর মতে, ডার্টমুরের প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো রিভসও যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম হেজ নয়। উত্তর-পশ্চিম কর্নওয়ালে পাঁচ হাজার বছরের বেশি পুরোনো হেজ এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন মানবসৃষ্ট কাঠামো, যা এখনো মূল উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মেগান জানান, কর্নওয়ালের হেজগুলোতে পাথরের ব্যবহার বেশি, কারণ সেখানে প্রবল বাতাস বয়ে যায়। অন্যদিকে দক্ষিণ ডেভনের হেজ বেশি জৈবিক, ফলে সেগুলো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। একটি সুস্থ, প্রাচীন ডেভন হেজ ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী আবাস।
ব্রিটেনে সাত লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি হেজরো রয়েছে। শুধু ডেভনেই রয়েছে প্রায় তিপ্পান্ন হাজার কিলোমিটার, যার অন্তত পঁচাত্তর শতাংশের বয়স ছয়শ বছরের বেশি। এত পরিচিত হওয়ায় আমরা এগুলোকে গুরুত্ব দিই না, অথচ এগুলো জীববৈচিত্র্যের ভাসমান আশ্রয়স্থল।

হেজ শুধু জমির সীমানা নয়, প্রকৃতির বহুমুখী উপহার। অসংখ্য পাখি, স্তন্যপায়ী, পোকামাকড় ও উদ্ভিদ এখানে বাস করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র পঁচাশি মিটার দীর্ঘ একটি হেজে দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতি পাওয়া গেছে। এগুলোর সবই খালি চোখে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা তিন হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
হেজ প্রাকৃতিক করিডর হিসেবেও কাজ করে। বনভূমির বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে যুক্ত করে প্রাণীদের চলাচল ও বংশবিস্তারে সহায়তা করে। কৃষকরাও উপকৃত হন। গরমে গবাদিপশু হেজের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়, যা দুধ উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক। ঝড়-বৃষ্টিতে হেজ প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে, নবজাতক মেষশাবকের মৃত্যুঝুঁকি কমায়। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব খামারে বেশি হেজ রয়েছে, সেখানে গবাদিপশুর রোগপ্রবণতা কম।
ফসলও উপকৃত হয়। হেজ মাটিকে উষ্ণ ও আর্দ্র রাখে, ফলে চাষাবাদের মৌসুম দীর্ঘ হয়। পাশাপাশি হেজে থাকা উপকারী পোকামাকড় ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমন ও পরাগায়নে সহায়তা করে।

কার্বন সংরক্ষণেও হেজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এক কিলোমিটার দীর্ঘ সুস্থ হেজ বছরে ছয়শ থেকে আটশ কিলোগ্রাম কার্বন শোষণ করতে পারে, যা উন্মুক্ত কৃষিজমির তুলনায় বত্রিশ শতাংশ বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পায়িত কৃষির আগমনে পরিস্থিতি বদলে যায়। বড় ক্ষেত তৈরির জন্য ভারী যন্ত্র ও রাসায়নিক ব্যবহারের পাশাপাশি অসংখ্য হেজ কেটে ফেলা হয়। এক সময় সরকার কৃষকদের হেজ অপসারণে অর্থ সহায়তাও দিয়েছিল। ১৯৫০ সালে যুক্তরাজ্যে হেজের দৈর্ঘ্য ছিল দশ লক্ষ কিলোমিটারের বেশি, যা ২০০৭ সালে নেমে আসে প্রায় চার লাখ সাতাত্তর হাজার কিলোমিটারে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি হারিয়ে গেছে।
পরবর্তী সময়ে আইন প্রণয়ন করে প্রাচীন হেজ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সমস্যা এখন রক্ষণাবেক্ষণে। সঠিকভাবে না কাটলে হেজ গাছের সারিতে পরিণত হয়ে যায় এবং জীববৈচিত্র্য হারায়। আবার অতিরিক্ত ছাঁটাই করলে ফুল-ফল কমে যায়। সমাধান হলো ‘হেজ লেইং’—প্রথাগত পদ্ধতিতে গাছের কাণ্ড আংশিক কেটে মাটির সমান্তরালে শোয়ানো, যাতে নতুন ডাল গজিয়ে হেজ ঘন হয়।

এই কাজ দক্ষতা ও সময়সাপেক্ষ। বর্তমানে দক্ষ হেজ লেয়ার কমে গেছে। যুদ্ধোত্তর সময়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে মানুষের স্রোত বাড়ায় এই কারুশিল্প প্রায় হারিয়ে যেতে বসে। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লক্ষ কিলোমিটার হেজের অন্তত অর্ধেকের জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। একজন অভিজ্ঞ কর্মী দিনে প্রায় পঁচিশ মিটার হেজ ঠিক করতে পারেন। ফলে কাজের পরিমাণ বিশাল।
তবু মেগান আশাবাদী। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে, অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই হেজ সংস্কার শুরু করেছেন। সরকারের লক্ষ্য ২০৫০ সালের মধ্যে বাহাত্তর হাজার কিলোমিটার নতুন বা পুনরুদ্ধার করা হেজ তৈরি করা। তবে এর জন্য আরও দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন।

ডার্টমুরের সেই প্রাচীন রিভসের কথা মনে পড়ে—যখন পিরামিড কেবল কল্পনায় ছিল, তখনও এই হেজ নির্মিত হয়েছিল। হয়তো ভবিষ্যতের হাজার বছর পরও ব্রিটেনের ভূদৃশ্য গড়ে দেবে এমনই যত্নে লালিত হেজরো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








