যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শনিবার ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা চালায়। তার আগে আলোচনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ দমনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এই সংকটে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও রাজনৈতিক শক্তি মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন। তাদের অবস্থান, কৌশল এবং বক্তব্যই বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: কঠোর নীতির ধারাবাহিকতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও ইরান প্রশ্নে বরাবরই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গত বছর তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালান।
গত মাসে ইরানে গণবিক্ষোভের সময় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, কর্তৃপক্ষ যদি অতীতের মতো জনগণকে হত্যা শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে। তার প্রথম মেয়াদে তিনি ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে ইরানকে দুর্বল করা। ২০১৮ সালে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের যে আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিল, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ করলেও তেহরান দাবি করে, তাদের কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক উদ্দেশ্যে। চলতি মাসে ট্রাম্প পরোক্ষ আলোচনা আবার শুরু করলেও হুমকির সুর কমাননি।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি: আপসহীন অবস্থান
৮৬ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতীক। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনির হাতেই রাষ্ট্রের বড় সব সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ক্ষমতা।
তার নেতৃত্বে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়েছে, যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে তিনি সার্বভৌম অধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার তার পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খামেনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান কখনও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। ২০২৫ সালের পারমাণবিক আলোচনার সময়ও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে কোনো চুক্তি কার্যকর ফল দেবে। আলোচনার পুনরারম্ভের সময় তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
তিনি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাতেও রাজি নন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু: সামরিক পদক্ষেপের প্রবক্তা
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে তার সামরিক অবস্থান স্পষ্ট হয়। তিনি জানিয়েছেন, ইরান পুনরায় হামলার সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করলে ইসরায়েল আবারও পদক্ষেপ নেবে।
সম্প্রতি তিনি সরাসরি ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেন, পারস্য জাতি শিগগিরই স্বৈরশাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হবে—এটাই তার আশা। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়, তবে তার কল্পনাতীত জবাব দেওয়া হবে।
নেতানিয়াহু বারবার ইরানের জনগণকে তাদের শাসকদের উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগে দুই দেশের যে সম্পর্ক ছিল, তা পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন।

রেজা পাহলভি: নির্বাসিত উত্তরাধিকারীর আহ্বান
ইরানের শেষ শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভি নিজেকে সম্ভাব্য গণতান্ত্রিক রূপান্তরের নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরছেন। বিপ্লবের আগে দেশ ছাড়ার পর তিনি আর ইরানে ফেরেননি।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে “পাহলভি ফিরে আসবে” স্লোগান তাকে আবারও আলোচনায় আনে। ৬৫ বছর বয়সী এই নেতা দেশ-বিদেশে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে ইরানের জনগণকে সমর্থনের অনুরোধ করেন।
মিউনিখে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তিনি একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রস্তুত। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসান এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন।
তবে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই তিনি বিতর্কিত। ২০২৩ সালে ইসরায়েল সফর এবং পিতার আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ায় তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

মোহাম্মদ বিন সালমান: ভারসাম্যের কৌশল
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে দুর্বল হতে দেখতে চাইলেও পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ুক, তা চান না। কারণ এতে পুরো অঞ্চল বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়তে পারে।
সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ সৌদি আরবের সঙ্গে শিয়া অধ্যুষিত ইরানের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে। ২০১৭ সালে যুবরাজ হওয়ার পর খামেনিকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘হিটলার’ বলে মন্তব্য করে তিনি তেহরানের অসন্তোষ বাড়ান।
তবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। এখন সৌদি আরব অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে, যেখানে পর্যটন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা তাই রিয়াদের প্রধান অগ্রাধিকার।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার সময় সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ ওয়াশিংটনকে সংযত থাকার আহ্বান জানায়। পরে যুবরাজ প্রতিশ্রুতি দেন, সৌদি ভূখণ্ড থেকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালাতে দেওয়া হবে না, যদিও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















