১২:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে পাখি কমছে দ্রুতগতিতে, উষ্ণতা ও কৃষির চাপে নতুন অশনিসংকেত পেরুর আত্মার সন্ধানে মারিও ভার্গাস লোসা: শেষ উপন্যাসে সংগীত, উন্মাদনা ও জাতিসত্তার মহাকাব্য অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ধর্মনিরপেক্ষতা নয়: মালয়েশিয়া–ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামি প্রভাবের উত্থান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরায়েল সংকট: কারা এই সংঘাতের প্রধান খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলায় এশিয়া জুড়ে উদ্বেগ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরান সংকট তীব্র, ট্রাম্প বললেন শাসন বদলের সুযোগ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে ফ্লাইট স্থগিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরান কাঁপছে, লক্ষ্য শীর্ষ নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, আবুধাবিতে নিহত ১

পেরুর আত্মার সন্ধানে মারিও ভার্গাস লোসা: শেষ উপন্যাসে সংগীত, উন্মাদনা ও জাতিসত্তার মহাকাব্য

পেরুর অমীমাংসিত রহস্য, রাজনীতি, ক্ষমতা আর সামাজিক টানাপোড়েন নিয়ে দীর্ঘ সাহিত্যজীবন কাটিয়েছেন নোবেলজয়ী কথাশিল্পী মারিও ভার্গাস লোসা। জীবনের অন্তিমপ্রান্তে এসে তিনি রেখে গেলেন এক আবেগমথিত বিদায়বার্তা—একটি উপন্যাস, যেখানে পেরুর আত্মা খুঁজে পাওয়া যায় তার নিজস্ব সংগীতে। “আই গিভ ইউ মাই সাইলেন্স” নামের এই শেষ উপন্যাস যেন লেখকের নিজের দেশকে বলা নীরব কিন্তু গভীর স্বীকারোক্তি।

শেষ উপন্যাসে পেরুর সংগীতের মহিমা

২০১০ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী লোসা গত বছরের এপ্রিলে ৮৯ বছর বয়সে মারা যান। রাজনীতি ও মানবিক হতাশার নির্মম চিত্র আঁকায় তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর শেষ উপন্যাসে উঠে এসেছে পেরুর নিজস্ব লোকসংগীত ‘ভালস’-এর কথা, যা ইউরোপীয় নৃত্যছন্দ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও পেরুর মাটিতে জন্ম নিয়ে এক স্বতন্ত্র সুরে বিকশিত হয়েছে।

বিশ শতকের শুরুর দিকে লিমার দরিদ্র উপনিবেশিক অলিগলি থেকে উঠে আসা এই সংগীত ধীরে ধীরে শ্রেণি ও বর্ণের বিভাজন পেরিয়ে গোটা জাতিকে এক আবেগে বাঁধে। আন্দিজ পাহাড় থেকে উপকূল—সবাই মেতে ওঠে ভালসের বেদনা ও উচ্ছ্বাসে। উপন্যাসের নায়ক তোনিও আজপিলকুয়েতা মনে করেন, এই ভালসই পেরুর বিশ্বের কাছে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক অবদান।

তোনিওর অনুসন্ধান ও এক রহস্যময় গিটারবাদক

তোনিও এক দরিদ্র সংগীতসমালোচক। লিমার ক্লাব ও বারে ঘুরে ঘুরে তিনি লোকসংগীত সংগ্রহ করেন, লিখে চলেন অখ্যাত সাময়িকীতে। সংসারের ভার টেনে নেন তাঁর স্ত্রী। স্বীকৃতি নেই, অর্থ নেই—তবু সংগীতের প্রতি তাঁর একাগ্রতা অটুট।

এক সন্ধ্যায় তিনি শোনেন অচেনা এক তরুণ গিটারবাদক লালো মলফিনোর সুর। ভাঙাচোরা প্রাসাদের বাগানে একক আলোয় দাঁড়িয়ে লালোর বাজনা যেন শ্রোতাদের স্তব্ধ করে দেয়। তোনিওর কাছে মনে হয়, এই সুরে তিনি পেয়ে গেছেন পেরুর আত্মা—যার খোঁজে তিনি সারা জীবন ঘুরেছেন।

লালোর জীবনের গল্পও রূপকথার মতো অথচ নির্মম বাস্তব। জন্মের পরই তাকে ফেলে যাওয়া হয়েছিল আবর্জনার স্তূপে। এক যাজক তাকে আশ্রয় দেন। পরিত্যক্ত গিটার কুড়িয়ে নিয়ে নিজেই ঠিক করে তোলে সে, আর সেই গিটারই হয়ে ওঠে তার অতিলৌকিক সুরের বাহন।

Nobel winner Mario Vargas Llosa inducted into Académie Française | Culture  | EL PAÍS English

জীবনী, উন্মাদনা ও জাতিসত্তার স্বপ্ন

তোনিও সিদ্ধান্ত নেন লালোর জীবনী লিখবেন। তাঁর বিশ্বাস, এই শিল্পীর গল্পে লুকিয়ে আছে পেরুকে একসূত্রে বাঁধার শক্তি। কিন্তু প্রকাশকেরা বই ফিরিয়ে দেন। অবশেষে এক দরিদ্র বইবিক্রেতা স্বল্পমূল্যে বইটি ছাপান। অপ্রত্যাশিতভাবে বইটি বিক্রি হয়ে যায়।

এই সাফল্য তোনিওকে আরও উন্মাদ করে তোলে। তিনি বইটি বাড়াতে থাকেন, পেরুর প্রাচীন ইতিহাস থেকে আধুনিক সময়—সবকিছু ঢোকাতে চান। তাঁর বিশ্বাস জন্ম নেয়, পেরুর প্রতিটি ঘটনা তাঁর কাহিনির কেন্দ্রে যুক্ত। এখানেই উপন্যাস প্রবেশ করে এক অন্ধকার, তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অঞ্চলে।

‘হুয়াচাফেরিয়া’: আবেগের ভাষায় জাতির মুখ

ভালস সংগীত ঘিরে পেরুতে গড়ে ওঠে এক বিশেষ মানসিকতা—‘হুয়াচাফেরিয়া’। এটি অতিরঞ্জিত আবেগ, নাটকীয় ভাষা আর অনুভূতির উচ্ছ্বাসে ভরা এক দৃষ্টিভঙ্গি। যুক্তির আগে অনুভূতি—এই প্রবণতা যেমন হাস্যরসাত্মক, তেমনি করুণ। লোসা এটিকে কখনও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, কখনও গভীর মমতায় তুলে ধরেছেন।

রাজনৈতিক রূপান্তর, কিন্তু সংস্কৃতির প্রতি আস্থা

জীবনে লোসার রাজনৈতিক অবস্থান বহুবার বদলেছে। বিপ্লবী বামপন্থা থেকে ইউরোপীয় উদারনীতির সমর্থক—সব পথই তিনি হেঁটেছেন। ১৯৯০ সালে পেরুর প্রেসিডেন্ট পদেও লড়েছিলেন। তবু শেষ পর্যন্ত তাঁর আস্থা ছিল শিকড়গাঁথা সংস্কৃতির শক্তিতে।

মৃত্যুর আগেই সমাপ্ত এই উপন্যাসে তাই ধরা পড়ে নির্মম বাস্তবতার পাশাপাশি কোমল সংবেদন। এটি এক লেখকের চূড়ান্ত বিদায়, যেখানে দেশ, সংগীত আর আত্মপরিচয় মিলেমিশে যায় এক গভীর সুরে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রে পাখি কমছে দ্রুতগতিতে, উষ্ণতা ও কৃষির চাপে নতুন অশনিসংকেত

পেরুর আত্মার সন্ধানে মারিও ভার্গাস লোসা: শেষ উপন্যাসে সংগীত, উন্মাদনা ও জাতিসত্তার মহাকাব্য

১১:০০:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পেরুর অমীমাংসিত রহস্য, রাজনীতি, ক্ষমতা আর সামাজিক টানাপোড়েন নিয়ে দীর্ঘ সাহিত্যজীবন কাটিয়েছেন নোবেলজয়ী কথাশিল্পী মারিও ভার্গাস লোসা। জীবনের অন্তিমপ্রান্তে এসে তিনি রেখে গেলেন এক আবেগমথিত বিদায়বার্তা—একটি উপন্যাস, যেখানে পেরুর আত্মা খুঁজে পাওয়া যায় তার নিজস্ব সংগীতে। “আই গিভ ইউ মাই সাইলেন্স” নামের এই শেষ উপন্যাস যেন লেখকের নিজের দেশকে বলা নীরব কিন্তু গভীর স্বীকারোক্তি।

শেষ উপন্যাসে পেরুর সংগীতের মহিমা

২০১০ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী লোসা গত বছরের এপ্রিলে ৮৯ বছর বয়সে মারা যান। রাজনীতি ও মানবিক হতাশার নির্মম চিত্র আঁকায় তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর শেষ উপন্যাসে উঠে এসেছে পেরুর নিজস্ব লোকসংগীত ‘ভালস’-এর কথা, যা ইউরোপীয় নৃত্যছন্দ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও পেরুর মাটিতে জন্ম নিয়ে এক স্বতন্ত্র সুরে বিকশিত হয়েছে।

বিশ শতকের শুরুর দিকে লিমার দরিদ্র উপনিবেশিক অলিগলি থেকে উঠে আসা এই সংগীত ধীরে ধীরে শ্রেণি ও বর্ণের বিভাজন পেরিয়ে গোটা জাতিকে এক আবেগে বাঁধে। আন্দিজ পাহাড় থেকে উপকূল—সবাই মেতে ওঠে ভালসের বেদনা ও উচ্ছ্বাসে। উপন্যাসের নায়ক তোনিও আজপিলকুয়েতা মনে করেন, এই ভালসই পেরুর বিশ্বের কাছে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক অবদান।

তোনিওর অনুসন্ধান ও এক রহস্যময় গিটারবাদক

তোনিও এক দরিদ্র সংগীতসমালোচক। লিমার ক্লাব ও বারে ঘুরে ঘুরে তিনি লোকসংগীত সংগ্রহ করেন, লিখে চলেন অখ্যাত সাময়িকীতে। সংসারের ভার টেনে নেন তাঁর স্ত্রী। স্বীকৃতি নেই, অর্থ নেই—তবু সংগীতের প্রতি তাঁর একাগ্রতা অটুট।

এক সন্ধ্যায় তিনি শোনেন অচেনা এক তরুণ গিটারবাদক লালো মলফিনোর সুর। ভাঙাচোরা প্রাসাদের বাগানে একক আলোয় দাঁড়িয়ে লালোর বাজনা যেন শ্রোতাদের স্তব্ধ করে দেয়। তোনিওর কাছে মনে হয়, এই সুরে তিনি পেয়ে গেছেন পেরুর আত্মা—যার খোঁজে তিনি সারা জীবন ঘুরেছেন।

লালোর জীবনের গল্পও রূপকথার মতো অথচ নির্মম বাস্তব। জন্মের পরই তাকে ফেলে যাওয়া হয়েছিল আবর্জনার স্তূপে। এক যাজক তাকে আশ্রয় দেন। পরিত্যক্ত গিটার কুড়িয়ে নিয়ে নিজেই ঠিক করে তোলে সে, আর সেই গিটারই হয়ে ওঠে তার অতিলৌকিক সুরের বাহন।

Nobel winner Mario Vargas Llosa inducted into Académie Française | Culture  | EL PAÍS English

জীবনী, উন্মাদনা ও জাতিসত্তার স্বপ্ন

তোনিও সিদ্ধান্ত নেন লালোর জীবনী লিখবেন। তাঁর বিশ্বাস, এই শিল্পীর গল্পে লুকিয়ে আছে পেরুকে একসূত্রে বাঁধার শক্তি। কিন্তু প্রকাশকেরা বই ফিরিয়ে দেন। অবশেষে এক দরিদ্র বইবিক্রেতা স্বল্পমূল্যে বইটি ছাপান। অপ্রত্যাশিতভাবে বইটি বিক্রি হয়ে যায়।

এই সাফল্য তোনিওকে আরও উন্মাদ করে তোলে। তিনি বইটি বাড়াতে থাকেন, পেরুর প্রাচীন ইতিহাস থেকে আধুনিক সময়—সবকিছু ঢোকাতে চান। তাঁর বিশ্বাস জন্ম নেয়, পেরুর প্রতিটি ঘটনা তাঁর কাহিনির কেন্দ্রে যুক্ত। এখানেই উপন্যাস প্রবেশ করে এক অন্ধকার, তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অঞ্চলে।

‘হুয়াচাফেরিয়া’: আবেগের ভাষায় জাতির মুখ

ভালস সংগীত ঘিরে পেরুতে গড়ে ওঠে এক বিশেষ মানসিকতা—‘হুয়াচাফেরিয়া’। এটি অতিরঞ্জিত আবেগ, নাটকীয় ভাষা আর অনুভূতির উচ্ছ্বাসে ভরা এক দৃষ্টিভঙ্গি। যুক্তির আগে অনুভূতি—এই প্রবণতা যেমন হাস্যরসাত্মক, তেমনি করুণ। লোসা এটিকে কখনও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, কখনও গভীর মমতায় তুলে ধরেছেন।

রাজনৈতিক রূপান্তর, কিন্তু সংস্কৃতির প্রতি আস্থা

জীবনে লোসার রাজনৈতিক অবস্থান বহুবার বদলেছে। বিপ্লবী বামপন্থা থেকে ইউরোপীয় উদারনীতির সমর্থক—সব পথই তিনি হেঁটেছেন। ১৯৯০ সালে পেরুর প্রেসিডেন্ট পদেও লড়েছিলেন। তবু শেষ পর্যন্ত তাঁর আস্থা ছিল শিকড়গাঁথা সংস্কৃতির শক্তিতে।

মৃত্যুর আগেই সমাপ্ত এই উপন্যাসে তাই ধরা পড়ে নির্মম বাস্তবতার পাশাপাশি কোমল সংবেদন। এটি এক লেখকের চূড়ান্ত বিদায়, যেখানে দেশ, সংগীত আর আত্মপরিচয় মিলেমিশে যায় এক গভীর সুরে।