এক দম্পতি সম্প্রতি এক কিশোরের আইনি অভিভাবক হয়েছেন। পারিবারিক সম্পর্ক না থাকলেও নিরাপত্তা, স্থিতি ও একটি ভালো ভবিষ্যতের আশায় তাঁরা নিজেদের ঘর খুলে দেন। শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও সময়ের সঙ্গে তৈরি হয়েছে দূরত্ব, ক্ষোভ ও মানসিক টানাপোড়েন। এখন প্রশ্ন, আইনগত দায়িত্বের বাইরে তাঁদের নৈতিক ও আবেগিক দায়িত্ব কোথায় শেষ হবে?
অস্থির অতীত, অনিশ্চিত বর্তমান
কিশোরটি অবহেলা ও মানসিক নির্যাতনের কঠিন অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন পরিবারে আসে। প্রথম কয়েক মাসে পড়াশোনায় উন্নতি, পারিবারিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ—সবই আশাব্যঞ্জক ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া, ফলাফলে অবনতি এবং অভিভাবকদের প্রতি ‘অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ’ ও ‘দমবন্ধ করা’ আচরণের অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
দম্পতি নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। আলাদা খাবারের ব্যবস্থা, বন্ধুর বাড়িতে থাকার সুযোগ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিসর বাড়িয়েও দূরত্ব কমেনি। অন্যদিকে তাঁদের নিজের সন্তানেরাও বাড়ির ভিন্ন মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এই অবস্থায় অভিভাবকের মনে অনিচ্ছাকৃত ক্ষোভ জন্ম নিচ্ছে, যা তাঁকে আরও অস্বস্তিতে ফেলছে।
পরামর্শচিকিৎসা ও প্রত্যাশার পুনর্গঠন
দম্পতি শিগগিরই পারিবারিক পরামর্শচিকিৎসায় যুক্ত হতে যাচ্ছেন। সেখানে কিশোরের অভিযোগ শুনতে হবে—যা কৃতজ্ঞতার অভাব বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সম্পর্কে উভয় পক্ষের প্রত্যাশা নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি স্কুলে উপস্থিতি, শালীন আচরণ ও পারস্পরিক সম্মানের মতো কিছু মৌলিক নিয়মে একমত হওয়াই হতে পারে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—এই কিশোরের জীবনে আগে ভাঙন ছিল। তাই আগেভাগে দূরত্ব তৈরি করে সম্পর্কের সহনশীলতা যাচাই করার প্রবণতা অস্বাভাবিক নয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সুখী পরিবারের অভিনয় করার বাধ্যবাধকতা নেই। আবেগ চাপিয়ে দেওয়া যায় না, তবে কাঠামো ও ধারাবাহিকতা দেওয়া যায়।

১৮ পেরোলে দায় কোথায়?
কিশোরটি প্রাপ্তবয়স্ক হলে দায়িত্ব কতটা থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী এক-দুই বছরে তৈরি হওয়া প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার ওপর। সম্পর্ক উষ্ণ হবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু জীবনে একবার হাত বাড়ালে হঠাৎ সম্পূর্ণ সরে যাওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একই সঙ্গে এই সম্ভাবনাও মেনে নিতে হবে, একসময় কিশোর নিজেই দূরে সরে যেতে পারে।
মৃত ব্যক্তির অপরাধ প্রকাশের দ্বিধা
একই আলোচনায় আরেকটি নৈতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। বহু বছর আগে এক সাবেক প্রধান শিক্ষকের যৌন নির্যাতনের কথা এক নারী গোপনে শেয়ার করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি এখন মৃত। তাঁকে ঘিরে সমাজে ইতিবাচক স্মৃতি রয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ করা উচিত কি না, তা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
একদিকে মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে সত্য প্রকাশ অন্য ভুক্তভোগীদের মানসিক সমর্থন দিতে পারে এবং ভ্রান্ত ইতিবাচক ভাবমূর্তি সংশোধন করতে পারে। তবে যিনি নির্যাতনের শিকার, তাঁর সম্মতি ছাড়া বিষয়টি প্রকাশ করা নৈতিক নয়। কারণ এতে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনিচ্ছাকৃতভাবে জনসমক্ষে চলে আসতে পারে। যদি ভুক্তভোগী নিজেই সামনে আসতে চান, তখন পাশে দাঁড়ানোই হবে প্রকৃত সহায়তা।
নৈতিকতার জটিল মানচিত্র
এই দুই ঘটনাই দেখায়, নৈতিকতা সবসময় সাদা-কালো নয়। অভিভাবকত্ব হোক বা অতীত অপরাধের সত্য উন্মোচন—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন সহানুভূতি, সংযম ও দায়িত্ববোধ। আইন মানা যথেষ্ট নয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ধৈর্য ও বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








