বয়স ৮৯। সময়ের ভারে ধীরে ধীরে গুটিয়ে এসেছে এক বাবার পৃথিবী। আর সেই পৃথিবীর প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর ছেলে, দীর্ঘদিনের অভিমান আর দূরত্ব বুকে নিয়ে। কিন্তু এক অপ্রত্যাশিত বিকেলে একটি ধারাবাহিক— ‘হিটেড রাইভালরি’— হয়ে উঠল সম্পর্কের নতুন সেতু।
ভুল উচ্চারণ থেকে শুরু
ছেলের ভাইয়ের মুখে শুনে বৃদ্ধ বাবা বললেন, তিনি নাকি “ভাইরাস” হয়েছেন। ছেলে ধীরে সংশোধন করলেন, “ভাইরাল”। ছোট্ট পার্থক্য, কিন্তু অর্থে বিশাল। ভাইরাস মানে সংক্রমণ, বিপদ। আর ভাইরাল মানে স্বীকৃতি, মানুষের দেখা পাওয়া।
দীর্ঘদিন ধরেই বাবা-ছেলের সম্পর্ক ছিল পরিমিত, হিসেবি। ছোটবেলা থেকেই ছেলে বুঝে গিয়েছিলেন, বাবা আবেগ নয়, সাফল্য আর শৃঙ্খলাকে মূল্য দেন। কান্না করলে বলা হতো শান্ত হও, উচ্ছ্বসিত হলে বলা হতো নিজেকে সামলাও। ভালোবাসা ছিল, কিন্তু প্রকাশ পেত নিয়ম আর নিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে।
দূরত্বের বছরগুলো
মায়ের মৃত্যুর পর সেই দূরত্ব আরও গাঢ় হয়। কথা বন্ধ হয়ে যায়। ছেলে মনে করেছিলেন, দূরত্বই হয়তো নিরাপদ। তবু উৎসবের দিন কিংবা নির্জন বিকেলে শূন্যতা তাঁকে নাড়া দিত।
নিজের জীবনের টুকরো টুকরো অংশ বাবাকে দেখাতে চেয়েছিলেন তিনি। বই শেয়ার করেছেন, লেখা শেয়ার করেছেন, এমনকি নিজের ভালোবাসার গল্পও বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই সেগুলো ভদ্র নীরবতায় থেমে গেছে।
‘হিটেড রাইভালরি’ দেখার প্রস্তাব
সেদিন বসার ঘরে আলো-ছায়ার মাঝে ছেলে বাবাকে দেখালেন তাঁর করা একটি ছোট ভিডিও। সেখানে তিনি বলেছিলেন ‘হিটেড রাইভালরি’ ধারাবাহিক নিয়ে, যা র্যাচেল রিডের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হকি খেলোয়াড়ের সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয়— এমন এক গল্প।
ছেলে ভেবেছিলেন, এখানেই হয়তো অস্বস্তি শুরু হবে। কিন্তু অবাক করে দিয়ে বাবা বললেন, তিনি সেটি দেখতে চান।
কিছুক্ষণ পর দুজন পাশাপাশি বসে সেই ধারাবাহিক দেখছিলেন। বরফে স্কেটের শব্দ, দর্শকের গর্জন আর দুই পুরুষের অস্বীকার করতে না পারা টান— সব মিলিয়ে ঘর ভরে উঠল অন্য এক আবহে।
নরম হয়ে আসা মুহূর্ত
ছেলে লক্ষ্য করলেন, বাবার শক্ত ভঙ্গি ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে। একটি দৃশ্যে চরিত্রটি নিজের চেপে রাখা অনুভূতি স্বীকার করলে বৃদ্ধ বাবার নিঃশ্বাস বদলে গেল। হাতের আঙুল চেয়ারের হাতলে শক্ত হয়ে উঠল।
পর্ব শেষে দীর্ঘ নীরবতার পর বাবা বললেন, “আমি জানতাম না।”
ছেলে জিজ্ঞেস করলেন, “কী জানতেন না?”
উত্তর এলো, “তোমার জন্য এটা কেমন।”
বছরের পর বছর যে স্বীকৃতি তিনি চাননি বলেই নিজেকে বোঝাতেন, সেই স্বীকৃতি যেন এক মুহূর্তে এসে দাঁড়াল সামনে।
দেরিতে আসা ভালোবাসা
কোনো অলৌকিক পরিবর্তন হয়নি। অতীত মুছে যায়নি। তবু কিছু একটা আলগা হলো। বাড়ি ফেরার সময় বাবা বললেন, তিনি খুশি যে ছেলে ভাইরাল হয়েছেন, মানুষ তাঁর কথা শুনছে।
গাড়ি চালাতে চালাতে ছেলে ভাবলেন, ভালোবাসা কখনও কখনও দেরিতে আসে। যখন দুজনই ক্লান্ত হয়ে নিজেদের রক্ষা করা বন্ধ করে দেন। একটি কুইয়ার হকি প্রেমের গল্প সম্পর্ক মেরামত করেনি, কিন্তু তৈরি করেছে এক টুকরো ভাগ করা অনুভূতি।
আর কখনও কখনও, সেই অসম্পূর্ণ, দেরিতে পাওয়া ভালোবাসাই যথেষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








