দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সমাজে ধর্মীয় প্রভাব কমেনি, বরং নতুন মাত্রায় শক্তিশালী হয়েছে। আধুনিকায়ন মানেই ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে অগ্রসর হওয়া—এমন দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে এই দুই দেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা।
একসময় এ অঞ্চলের সরকারগুলো জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। এখন দৃশ্যপট ভিন্ন। ইসলাম রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, আইন, ভোক্তা সংস্কৃতি ও সামাজিক চাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাজের কেন্দ্রে জায়গা করে নিচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ায় নতুন ফৌজদারি বিধি
ইন্দোনেশিয়ায় সম্প্রতি কার্যকর হয়েছে নতুন ফৌজদারি বিধি, যেখানে বিয়ের আগে যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ধর্মদ্রোহ ও ধর্মত্যাগ সংক্রান্ত অপরাধের পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। পাশাপাশি “চলমান আইন” স্বীকৃতি দেওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন শরিয়াভিত্তিক বিধান প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে, যা নারী ও সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি করছে।
রাষ্ট্রীয় আদর্শ পঞ্চশীলা নাস্তিকতাকে নিষিদ্ধ করলেও ইসলাম, প্রোটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক, বৌদ্ধ, হিন্দু ও কনফুসীয়—এই ছয় ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্রে নাহদাতুল উলামার মতো সংগঠন অন্তর্ভুক্তিমূলক ইসলামের প্রচার চালায়। তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বড় ভূমিকা রাখছে এবং ইসলামি মূল্যবোধ ও গণতন্ত্রকে পরস্পর পরিপূরক হিসেবে তুলে ধরছে।
তবু বাস্তবতা হলো, ধর্মীয় অনুশীলন বেড়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষে যেখানে খুব কম নারী হিজাব পরতেন, এখন তা তিন-চতুর্থাংশে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন আইন দিয়ে নয়, সামাজিক প্রবণতা ও স্বেচ্ছা গ্রহণের মাধ্যমে এসেছে।
মালয়েশিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের প্রতিযোগিতা
মালয়েশিয়ায় ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। রাজ্যগুলো ধর্মীয় বিষয়ে এখতিয়ার রাখে এবং কেন্দ্রীয় ইসলামি উন্নয়ন দপ্তর জাতীয়ভাবে সমন্বয় করে। ২০২৬ সালের বাজেটে ইসলামি উন্নয়নে রেকর্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা অমুসলিম উপাসনালয় রক্ষণাবেক্ষণের তুলনায় বহু গুণ বেশি।
এ দেশে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ইসলাম বড় ইস্যু। মালয় ভোটারদের সমর্থন পেতে শাসক ও বিরোধী দল একে অপরকে ছাড়িয়ে আরও ইসলামপন্থী অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর ফলে সমাজ আরও রক্ষণশীল হয়ে উঠছে।
দ্বৈত বিচারব্যবস্থায় দেওয়ানি ও শরিয়া আদালত আলাদা হলেও বাস্তবে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের প্রভাব বাড়ছে। ধর্মান্তর ও সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধে টানাপোড়েন স্পষ্ট। সম্প্রতি এক ব্যক্তি খ্রিস্টান ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করে বিয়ে করার পর পুনরায় আগের ধর্মে ফিরতে চাইলে আপিল আদালত জানায়, বিষয়টি শরিয়া আদালতের এখতিয়ারেই পড়বে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন ধর্মীয় বিতর্ক, প্রচার ও নজরদারির বড় ক্ষেত্র। স্বল্পদৈর্ঘ্য ধর্মীয় ভিডিও, তারকা বক্তা এবং অনলাইন প্রচারণা তরুণদের প্রভাবিত করছে। মালয়েশিয়ায় এক নৃত্যশিক্ষিকার পোশাক নিয়ে ভাইরাল বিতর্কের জেরে ধর্মীয় দপ্তর তদন্ত শুরু করে।
সমকামী অধিকারকেন্দ্রিক একটি সংগঠন অনলাইন সমালোচনার মুখে ব্যক্তিগত আয়োজন বাতিল করতে বাধ্য হয়। “আল্লাহ” শব্দযুক্ত মোজা বিক্রির অভিযোগে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় সামাজিক ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
আধুনিকায়ন বনাম ধর্মীয় মর্যাদা
পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধর্মীয় অনুশীলন কমিয়েছে—এমন উদাহরণ থাকলেও মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সমাজে কী মর্যাদাপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় সেটিই মূল বিষয়। এখন ধার্মিকতা মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠছে।
ইন্দোনেশিয়া এখনো বহুত্ববাদ ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তবে নতুন আইন ও সামাজিক চাপের প্রেক্ষাপটে তা টিকিয়ে রাখতে সতর্কতা জরুরি। আর মালয়েশিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















