অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে প্যারিসের আকাশরেখায় একা দাঁড়িয়ে থাকা ট্যুর মনপারনাসে নতুন অধ্যায়ের পথে। বহু সমালোচনা, ঠাট্টা আর বিতর্কের পর অবশেষে এই বহুতল ভবন ও তার আশপাশের এলাকা পাচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রূপান্তর। স্থপতিদের এক দল ভবনটিকে হালকা, উন্মুক্ত ও সবুজায়নে ঘেরা আধুনিক রূপে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে একাকী অট্টালিকা
১৯৭৩ সালে চালু হওয়ার পর থেকেই ট্যুর মনপারনাসে প্যারিসবাসীর সমালোচনার মুখে। অনেকেই এটিকে শহরের ঐতিহ্যবাহী নান্দনিকতার সঙ্গে বেমানান বলে মনে করেন। রসিকতা করে কেউ কেউ বলেন, যেন এটি আইফেল টাওয়ারের বাক্স। তবু ২১০ মিটার উচ্চতার এই ভবনই এখনো প্যারিস শহরের একমাত্র আকাশচুম্বী অট্টালিকা।
নতুন নকশায় সবুজের ছোঁয়া
ফরাসি স্থপতিদের সমন্বয়ে গঠিত নুভেল এওএম ভবনটিকে আরও স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত রূপ দিতে চায়। পরিকল্পনায় রয়েছে বারান্দাজুড়ে সবুজ গাছপালা, উল্লম্ব রেখার ভাঙন এবং ছাদজুড়ে একটি ঘন বাগান। লক্ষ্য একটাই—কঠিন কংক্রিটের চেহারা বদলে পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য তৈরি।

এলাকাজুড়ে প্রাণ ফেরানোর উদ্যোগ
ভবনের নিচতলার বাণিজ্যিক কেন্দ্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন ইতালীয় স্থপতি রেনজো পিয়ানো। তিনি জানান, পুরো কাঠামো ভেঙে ফেলার বদলে রূপান্তরই তাঁর লক্ষ্য। পরিকল্পনায় রয়েছে হাঁটার পথ, গাছঘেরা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ এবং স্থানীয়দের জন্য ব্যবহারযোগ্য খোলা জায়গা। তাঁর মতে, পুরোনো কাঠামোকে টেকসইভাবে নতুন রূপ দেওয়া সম্ভব এবং সেটিই সময়ের দাবি।
রাজনীতি, অর্থ আর মতভেদের টানাপোড়েন
এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় সাতশো মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ। দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়ন, রাজনৈতিক মতভেদ ও নকশা নিয়ে বিতর্কে আটকে ছিল কাজ। স্থানীয় প্রশাসনের কেউ কেউ মনে করেন, প্রকল্পটি অতিরিক্ত বাণিজ্যিক হয়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জায়গা রাখা হয়নি। আবার পরিবেশকর্মীদের একাংশের উদ্বেগ, সংস্কারের ফলে সেখানে বসবাসরত পাখিদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সমালোচনা সত্ত্বেও এক অদ্ভুত প্রতীক
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্যুর মনপারনাসে এক অদ্ভুত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পর্যটকেরা এখনো এর পর্যবেক্ষণ ডেকে ভিড় করেন। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও ভবনটির উপস্থিতি রয়েছে। তবু প্যারিসের পরিচয় এখনো মূলত ঐতিহাসিক স্থাপত্য, সরু রাস্তা আর খোলা চত্বরে সীমাবদ্ধ। আকাশচুম্বী ভবনগুলোকে শহরের বাইরে সরিয়ে রাখাই ছিল দীর্ঘদিনের নীতি।
টেকসই স্থাপত্যের বার্তা
নতুন পরিকল্পনায় পুরোনো কংক্রিট কাঠামোর বড় অংশ পুনর্ব্যবহার করা হবে, যাতে নির্মাণকাজে কার্বন নিঃসরণ কমে। স্থপতিদের মতে, আধুনিকতার সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতার সমন্বয়ই এই সময়ের চাহিদা।
আগামী মার্চের শেষে ভবনটি সম্পূর্ণ খালি করে সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার কথা। প্যারিসবাসীর দীর্ঘদিনের বিতর্কিত অট্টালিকা কি এবার সত্যিই নতুন রূপে গ্রহণযোগ্যতা পাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে সময়ই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








