ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠেছে। শনিবার ভোরে শুরু হওয়া এই অভিযানে তেহরানসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অভিযানের প্রথম ধাক্কা
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। প্রথম দফার হামলায় ইরানের উচ্চপদস্থ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তবে তাদের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরানি সূত্র বলছে, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একাধিক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
তেহরানে আতঙ্ক, ব্যাংক ও পেট্রোল পাম্পে ভিড়
হামলার পর রাজধানী তেহরানে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলতে ছুটে যান। শহরজুড়ে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হতে পারে, ফলে বিদেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় চল্লিশ জন নিহত হওয়ার খবর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যদিও এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইরানের পাল্টা জবাব
হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, অঞ্চলে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি তাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে। প্রতিশোধ অব্যাহত থাকবে বলেও তারা ঘোষণা দেয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ইরাকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, আত্মরক্ষায় ইরান সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বিস্ফোরণ
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি ও বাণিজ্যিক নগরী দুবাইয়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সেবা কেন্দ্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কাতার জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় আসা সব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। ইরানের খার্গ দ্বীপের কাছেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে, যেখান দিয়ে দেশটির অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়।
পারমাণবিক আলোচনায় অচলাবস্থা
এই হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। তবে সাম্প্রতিক বৈঠকে কোনো অগ্রগতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইরান অবশ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তারা কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু আলাদা।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বার্তা
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ১৯৭৯ সালের তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনার কথা তুলে ধরে বলেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই অভিযান ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার জন্যই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, এই যৌথ হামলা ইরানের জনগণের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট বাতিল করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে এই নতুন সংঘাত কতদূর গড়ায়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















