ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শনিবার মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একের পর এক ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিশ্বব্যাপী বিমান সংস্থাগুলো। এতে অঞ্চলটি আবারও সামরিক উত্তেজনার মুখে পড়েছে।
ফ্লাইট মানচিত্রে দেখা গেছে, ইরান, ইরাক, কুয়েত, ইসরায়েল ও বাহরাইনের আকাশপথ প্রায় ফাঁকা। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক হামলা শুরু করেছে। এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা আঘাত হানে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ইসরায়েলে যাওয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৃহত্তর অঞ্চলে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কাতারের দোহাসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দোহায় মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাইতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

এই উত্তেজনা তেহরানের পারমাণবিক ইস্যুতে পশ্চিমাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের আশা ম্লান করেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির পর পরিস্থিতি আবারও সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মধ্যে ব্যস্ত এই অঞ্চলে বিমান চলাচল নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ইরান ও ইরাক থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই আকাশপথ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ বিমান সংস্থাগুলো ওই দুই দেশের আকাশপথ এড়িয়ে চলছে।
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো এখন বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বড় পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আকাশে হামলার ঝুঁকির কারণে বাণিজ্যিক বিমান ভূপাতিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। দীর্ঘতর ফ্লাইটপথের ফলে জ্বালানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হামলার পর ইসরায়েল, ইরান, ইরাক, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও জর্ডান তাদের আকাশপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং মানচিত্রে দেখা গেছে, বিমানগুলো এসব এলাকা এড়িয়ে চলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউরোপীয় এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি শনিবার তাদের সদস্য বিমান সংস্থাগুলোকে চলমান সামরিক অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত আকাশপথ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ৩ মার্চ পর্যন্ত তেল আবিব ও বাহরাইনে ফ্লাইট বাতিল করেছে। শনিবার আম্মানগামী ফ্লাইটও বাতিল করা হয়েছে।
রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির বিমান সংস্থাগুলো ইরান ও ইসরায়েলে ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
জার্মানির লুফথানসা শনিবার ও রবিবার দুবাইগামী ও দুবাই থেকে ফ্লাইট স্থগিত করেছে এবং ৭ মার্চ পর্যন্ত তেল আবিব, বৈরুত ও ওমান রুট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এয়ার ফ্রান্স তেল আবিব ও বৈরুতগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে।
আইবেরিয়া তেল আবিবগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। উইজ এয়ার তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েল, দুবাই, আবুধাবি ও আম্মানগামী এবং সেখান থেকে ফ্লাইট ৭ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অঞ্চলটির আকাশপথ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকতে পারে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনাও আকাশপথ ব্যবহারে আরও সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, বর্তমান শত্রুতা আঞ্চলিক বিমান চলাচলে তাৎক্ষণিক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রভাব ফেলছে। হুমকির মাত্রা বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু বিমানবন্দর সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ বা আংশিক খালি করা হতে পারে, যা গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্রগুলোকে বিঘ্নিত করবে।

এয়ার ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন ভারতীয় বিমান সংস্থাও মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
আঞ্চলিক আকাশপথ বন্ধের ফলে এমিরেটসের বেশ কয়েকটি ফ্লাইট ব্যাহত হয়েছে বলে দুবাইভিত্তিক সংস্থাটি জানিয়েছে। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফ্লাইদুবাইও চলমান পরিস্থিতির কারণে শনিবার সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
কাতার এয়ারওয়েজ ও কুয়েত এয়ারওয়েজ সাময়িকভাবে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। তুর্কি এয়ারলাইন্সও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গন্তব্যে ফ্লাইট বাতিল করেছে।
কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানগামী সব ফ্লাইট বন্ধ থাকবে। ওমান এয়ার জানিয়েছে, আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে বাগদাদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের কেএলএম জানিয়েছে, ইরানে হামলার পর শনিবার নির্ধারিত আমস্টারডাম-তেল আবিব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং পরিষেবা স্থগিতের সিদ্ধান্ত এগিয়ে আনা হয়েছে। আগে ঘোষণা অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার কথা ছিল। শনিবার তেল আবিবে একটি মাত্র ফ্লাইট নির্ধারিত ছিল।
ভার্জিন আটলান্টিক জানিয়েছে, তারা সাময়িকভাবে ইরাকের আকাশপথ এড়িয়ে চলছে, ফলে কিছু ফ্লাইট নতুন রুটে পরিচালিত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















