মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকি দূর করবে এবং ইরানের জনগণকে তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ দেবে।
হামলার পরপরই ইরান পাল্টা আঘাত হানে। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড জানায়, তারা অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং এই অভিযান শত্রুর পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত চলবে।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলা
শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নেতৃত্বকেও লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে টার্গেট করা হয়েছিল। তবে হামলার ফলাফল সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।
এর আগে একটি সূত্র জানায়, খামেনিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তিনি তেহরানে ছিলেন না। ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বিপ্লবী গার্ডের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

ইরানের পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
ইরান জানায়, তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। আবুধাবিতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বাহরাইন নিশ্চিত করেছে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা হয়েছে এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের একটি সেবা কেন্দ্র আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দুবাইতেও বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা নতুন দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছে, এমন হামলা অব্যাহত থাকলে তার পরিণতি হবে গুরুতর।
সিরিয়ায় ক্ষয়ক্ষতি
দক্ষিণ সিরিয়ার সুয়েইদা শহরে একটি ভবনে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে চারজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। কুনেইত্রা ও দারায়ও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে। দামেস্কের আকাশে একাধিক প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেছে এবং সারাদিন যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেছে।

ইসরায়েলে জরুরি অবস্থা
ইসরায়েল দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, স্কুল ও কর্মস্থল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং হাসপাতালের রোগীদের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার রিজার্ভ সেনাকে ডাকা হয়েছে। জনগণকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
তেল আবিবের শেবা মেডিকেল সেন্টারসহ বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেরুজালেমে মানুষকে খাদ্য ও নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে।
ইরানে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪০ জনে দাঁড়িয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। এর আগে গভর্নর ২৪ জন নিহতের কথা বলেছিলেন।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয়েছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনাও এই সংঘাতের কারণে ব্যাহত হয়েছে বলে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।
![]()
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ একতরফা সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, এটি কেবল স্বল্পমেয়াদি সংঘর্ষ নয়, বরং শাসন টিকে থাকার লড়াই। তার মতে, এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে ইরানের সাধারণ মানুষ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাতকে ১৯৭৯ সালের পর থেকে চলা দীর্ঘ বৈরিতার চূড়ান্ত অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এই সংঘাতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করাতে চাইছেন।
বিমান চলাচলে বিঘ্ন
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করেছে। ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ সেবাদাতা ওয়েবসাইটে দর্শনার্থীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়, ফলে অনেক ব্যবহারকারী ত্রুটি বার্তা পান।

রমজান ও পুরিমের প্রেক্ষাপট
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানে রমজান মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ইহুদিদের পুরিম উৎসবও সামনে, যা প্রাচীন পারস্যে ইহুদিদের রক্ষা পাওয়ার স্মৃতি বহন করে। ধর্মীয় আবহের মধ্যে এই সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এই সামরিক মুখোমুখি অবস্থান কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে দিয়েছে। তেল উৎপাদনকারী উপসাগরীয় দেশগুলোও চরম সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















