বিশ্ব রাজনীতিতে “হস্তক্ষেপ না করার নীতি” দীর্ঘদিন ধরে চীনের অন্যতম কূটনৈতিক পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে বেইজিং নিজেকে এমন এক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি জড়ায় না। পশ্চিমা শক্তির সামরিক আগ্রাসনের বিপরীতে নিজেদের সংযত ও বিকল্প মডেল হিসেবে তুলে ধরাই ছিল এই অবস্থানের মূল লক্ষ্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নীতিগত অবস্থানও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠছে—নিজের বৈশ্বিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে চীন কি শেষ পর্যন্ত সেই একই পথে হাঁটছে, যাকে একসময় সে সাম্রাজ্যবাদ বলে সমালোচনা করত?
বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে বর্তমান বিশ্ব আর নিয়মভিত্তিক নয়; বরং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতার এক অনিশ্চিত ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব দুর্বল হচ্ছে, পুরোনো জোটগুলো ভঙ্গুর হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে—চীনা নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এখন এমন মূল্যায়ন করছেন। কিন্তু এই পরিবর্তনকে তারা কেবল সুযোগ হিসেবে দেখছেন না। বরং তাদের আশঙ্কা, ক্ষমতা হারাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে এবং নিজের প্রভাব ধরে রাখতে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের ব্যবহার বাড়াবে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের উদ্বেগের মূল কারণ তার বিস্তৃত বৈশ্বিক উপস্থিতি। বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে চীনের অর্থনীতি এখন অসংখ্য সমুদ্রপথ, খনিজ সম্পদ, বন্দর, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদেশি অবকাঠামো প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। আফ্রিকার খনি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার করিডর থেকে পানামা খাল—সবকিছুই এখন বেইজিংয়ের নিরাপত্তা ভাবনার অংশ। ফলে বিদেশে অস্থিতিশীলতা মানেই চীনের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি।
এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন শুধু বাণিজ্যিক উপস্থিতি বাড়ায়নি, বরং নিরাপত্তা কাঠামোকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্প্রসারণ করতে শুরু করেছে। গোয়েন্দা সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি, বিদেশে বন্দর ও সামরিক স্থাপনা, এমনকি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার—সব মিলিয়ে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য কেবল প্রতিরক্ষা নয়; বরং সংকটের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে বিদেশি ভূখণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া।

চীনের অভ্যন্তরীণ নীতিবিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে এখন এই পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। কেউ কেউ বলছেন, পুরোনো “হস্তক্ষেপ না করার নীতি” বর্তমান বাস্তবতায় আর কার্যকর নয়। তাদের যুক্তি, যদি বিদেশি সরকার চীনের স্বার্থবিরোধী আচরণ করে অথবা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট ও সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে বেইজিংয়ের আরও প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। এ ধরনের আলোচনায় “সক্রিয় হস্তক্ষেপ” বা “নতুন ধরনের হস্তক্ষেপবাদ” শব্দও উঠে আসছে।
এই চিন্তার পেছনে আরেকটি মনস্তত্ত্ব কাজ করছে। চীনের কিছু কৌশলবিদ মনে করেন, দীর্ঘ শান্তিকাল দেশটির সমাজে এক ধরনের “সংঘর্ষভীতি” তৈরি করেছে। তাদের মতে, একটি উদীয়মান শক্তি কেবল অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে নয়, প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেও নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। দক্ষিণ চীন সাগরে আগ্রাসী অবস্থান, সীমান্ত সংঘর্ষ কিংবা আঞ্চলিক সামরিক চাপ—এসবকে তারা ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি হিসেবে দেখেন।
তবে এখানেই চীনের জন্য সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। কারণ ইতিহাস বলছে, বৈশ্বিক স্বার্থ যত বিস্তৃত হয়, সেগুলো রক্ষার জন্য তত বেশি সামরিক ও রাজনৈতিক জড়িয়ে পড়া অনিবার্য হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রও একসময় নিজেদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু বিদেশে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের হস্তক্ষেপও বেড়েছে। একসময় যা ছিল নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাত, পরে তা পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নীতিতে।
চীন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভুলগুলো এড়াতে চাইবে। তারা সম্ভবত সরাসরি আগ্রাসনের বদলে “দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা”, “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান” বা “আইনশৃঙ্খলা সহায়তা”র মতো ভাষা ব্যবহার করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশে প্রভাব বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রতিরোধ, রাজনৈতিক জটিলতা এবং নতুন সংঘাতও তৈরি হবে। একবার কোনো অঞ্চলকে “কৌশলগত স্বার্থ” হিসেবে চিহ্নিত করলে, সেই স্বার্থ রক্ষার জন্য ক্রমাগত আরও বেশি উপস্থিতি দরকার হয়। আর সেই উপস্থিতিই শেষ পর্যন্ত নতুন ধরনের সাম্রাজ্যিক বোঝা তৈরি করে।
মাও সেতুং একসময় বলেছিলেন, বিদেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই একদিন আমেরিকার গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়াবে। আজ চীন যখন নিজস্ব বৈশ্বিক নিরাপত্তা বলয় গড়তে শুরু করেছে, তখন সেই সতর্কবাণীই যেন নতুন অর্থে ফিরে আসছে। শক্তির বিস্তার যেমন প্রভাব বাড়ায়, তেমনি তা নতুন দায়, সংঘাত এবং অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি করে। বেইজিং এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে বৈশ্বিক শক্তি হয়ে ওঠার মূল্য তাকে নিজেকেই নির্ধারণ করতে হবে।
স্যাম চেটউইন জর্জ 


















