মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মাঝেও বহু বছর ধরে দুবাই নিজেকে উপস্থাপন করেছে একটি নিরাপদ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে। ঝকঝকে নগরী, করমুক্ত আয় এবং সহজ ব্যবসা পরিবেশের কারণে বিশ্বের নানা প্রান্তের বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের কাছে এটি ছিল নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরানি হামলার পর সেই দীর্ঘদিনের বিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
গালফ অঞ্চলে পাল্টা হামলার ঘটনায় দুবাইয়ের বিমানবন্দর, বন্দর ও হোটেলসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শুধু অবকাঠামোগত ক্ষতিই নয়, শহরটির নিরাপদ ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তিও বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
হামলার পর আস্থার সংকট
ইরানের পাল্টা হামলার পর দুবাইয়ের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং জেবেল আলি বন্দরের একটি অংশে আগুন লাগে।
ঘটনার পর বহু বাসিন্দা আতঙ্কে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেন এবং অনেকেই জরুরি খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত করতে শুরু করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানালেও বিনিয়োগকারী ও বাসিন্দাদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, শারীরিক ক্ষতির চেয়ে মানসিক প্রভাবই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত একটি শহরে এমন হামলা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বন্ধ বাজার, থমকে গেছে অর্থনৈতিক কার্যক্রম
হামলার পর টানা দুই দিন বন্ধ রাখা হয়েছে আবুধাবি ও দুবাইয়ের শেয়ারবাজার। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতে আঘাত লাগায় কিছু ব্যাংকিং কার্যক্রমেও সাময়িক বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। আকাশপথ আংশিক বন্ধ থাকায় হাজার হাজার যাত্রী আমিরাতে আটকে পড়েছেন।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে এবং নতুন অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে সোনার বারের চাহিদা দ্রুত বেড়ে গেছে বলে জানা গেছে।

কীভাবে তৈরি হয়েছিল ‘ব্র্যান্ড দুবাই’
একসময় ছোট একটি মুক্তা আহরণ ও মাছ ধরার বন্দর ছিল দুবাই। কয়েক দশকের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি বিশ্বের অন্যতম আর্থিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। উড়োজাহাজ সংস্থা চালু হওয়া, বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ এবং বিদেশিদের সম্পত্তি কেনার সুযোগ দেওয়া—এসব পদক্ষেপ শহরটির বৈশ্বিক পরিচিতি গড়ে তোলে।
বর্তমানে দুবাইয়ের অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি তেলবহির্ভূত খাতের ওপর নির্ভরশীল। বাণিজ্য, পর্যটন, উচ্চমূল্যের আবাসন এবং আর্থিক সেবার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এর অর্থনৈতিক কাঠামো। বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের সময় বহু ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারী এখানে এসে বসতি গড়েছেন, যার ফলে জনসংখ্যা ও বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাড়বে ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে আন্তর্জাতিক পুঁজি অন্য নিরাপদ বাজারের দিকে সরে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত অতীতে বিভিন্ন সংকটেও স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পেরেছে। শক্তিশালী নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পুঁজি প্রত্যাহারের সম্ভাবনা এখনও কম।
তবু সাম্প্রতিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক মানচিত্রে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—দুবাই কি আগের মতোই নিরাপদ বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে আস্থা ধরে রাখতে পারবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















