মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, সীমিত ফ্লাইট এবং নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে অনেকেই এখন বিকল্প পথ খুঁজে মরিয়া হয়ে অঞ্চল ছাড়ার চেষ্টা করছেন।
আকাশপথ বন্ধ, ভ্রমণকারীদের চরম দুর্ভোগ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার পর কাতারের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানে ট্রানজিটে থাকা প্রায় আট হাজার যাত্রী হঠাৎ করেই আটকে পড়েন। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট চালু থাকায় পর্যটক ও প্রবাসীরা বিপাকে পড়েছেন।
দুবাই এবং দোহা সাধারণত ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিমান চলাচলের অন্যতম বড় কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এখান দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর এই ব্যস্ত রুটগুলোতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ ও জটিল যাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা
দুবাইয়ে বসবাসকারী সারা নামের এক নারী নিরাপদে জার্মানিতে পৌঁছাতে প্রায় তেত্রিশ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার পরিকল্পনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নির্ধারিত ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ভোরে গাড়িতে করে ওমানের রাজধানী মাসকাটে যাবেন। সেখান থেকে জেদ্দা হয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর পরিকল্পনা তার।
তার ভাষায়, যাত্রাটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তাকে এই পথই বেছে নিতে হয়েছে।
সংঘাতের বিস্তার ও নিরাপত্তা সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে পরে তিনি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। এই সংঘাতে ইরান শুধু ইসরায়েল বা মার্কিন বাহিনীকেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এদিকে কুয়েত ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের দ্রুত অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে নিজেদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি ও জার্মানি বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে, যাতে ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে নেওয়া যায়।
ওমান হয়ে পালানোর নতুন পথ
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ওমান তুলনামূলকভাবে কম হামলার শিকার হওয়ায় দেশটির আকাশপথ এখনও খোলা রয়েছে। ফলে অনেক যাত্রী এখন ওমান হয়ে অঞ্চল ছাড়ার চেষ্টা করছেন।
ওমানের জাতীয় বিমান সংস্থা এবং একটি স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা শরজাহ থেকে মাসকাট পর্যন্ত বাস চালু করেছে। এই যাত্রায় সময় লাগে প্রায় আট ঘণ্টা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য প্রবাসী মাসকাট বিমানবন্দরে পৌঁছানোর উপায় খুঁজছেন।
ব্যক্তিগত গাড়ি ও সীমান্তপথে ভিড়
অনেকেই এখন ব্যক্তিগত গাড়ি বা ভাড়ার যানবাহনে করে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছেন। দুবাই থেকে ওমান সীমান্তের দূরত্ব প্রায় দেড়শ কিলোমিটার। আগে যেখানে পর্যটক বা প্রকৃতিপ্রেমীরা যাতায়াত করতেন, এখন সেই পথই হয়ে উঠেছে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার প্রধান উপায়।
একাধিক ট্যুর অপারেটর জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনে সীমান্তে পৌঁছানোর জন্য অসংখ্য ফোন পাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এখন দ্রুত অঞ্চল ছাড়ার চেষ্টা করছেন।
সৌদি আরবও বিকল্প রুট
ওমানের পাশাপাশি সৌদি আরবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে। এক ব্রিটিশ নাগরিক জানিয়েছেন, দুবাই থেকে গাড়িতে করে সৌদি সীমান্তে পৌঁছে তিনি রিয়াদে ফিরেছেন। পুরো যাত্রায় প্রায় এগারো ঘণ্টা সময় লাগে।
তবে এই যাত্রা এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। সাধারণ সময়ে যেখানে একমুখী বিমানের টিকিটের দাম প্রায় দুইশ ডলার, সেখানে সীমান্তপথে যাতায়াত করতে অনেকেরই খরচ হচ্ছে এক হাজার ডলারের বেশি।
সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। নিরাপদে অঞ্চল ছাড়ার জন্য বিকল্প পথ খোঁজা এখন হাজার হাজার মানুষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















