পৃথিবীব্যাপী সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটিয়েছে বহুবার। স্বাভাবিকভাবে কালের নিয়ম ধরে এই পরিবর্তন সূচিত হয়েছে ইতিহাসকে বোঝার উপাদানগুলোর মধ্যেও। বদল এসেছে ইতিহাসের গবেষণা পদ্ধতিতে । যার ফলস্বরূপ, বর্তমানে উত্তর-আধুনিকতা প্রচলিত ব্যাখানগুলিকে তার্কিক প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে একটি বিরুদ্ধ স্বর গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ভারতবর্ষের তাত্ত্বিক জগতেও এর ফল সুদূরপ্রসারী। এক্ষেত্রে নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার কথা বলা যেতে পারে। এই গবেষণা পদ্ধতির উদ্ভাবন ভারতবর্ষেই।
কলেজ জীবনে এই চিন্তার নদীতে আমিও কিছুটা প্রতিকূল হবার চেষ্টা করেছিলাম। স্মরণ করতে পারি, কলেজ জীবনে কিছু বন্ধু আমায় চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলো এই বলে যে , ‘History’ শব্দটার মধ্যেই (His-Story) পুরুষতান্ত্রিকতার ছাপ লুকিয়ে আছে, এটা বদলানো দরকার। কিন্তু বলা বাহুল্য চিন্তার অপরিপক্কতার কারণে আমি বেশিদূর এগোতে পারিনি।
শৈশবে আমাদের ইতিহাস বইতে, ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে মুদ্রা, ধাতবের ব্যবহার, ঐতিহাসিক ভাস্কর্য্য় এবং পুরুষালী চরিত্রসমূহ প্রধানত প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। এখন এর পরিবর্তন দরকার। তবে এই লেখার উদ্দেশ্য ইতিহাসের তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। ইতিহাস চর্চায় যে উপাদানভিত্তিক আলোচনার একটি বৃহত্তর প্রসার তৈরী হয়েছে, সেই চিন্তাকে পাথেয় করে, একটি আঞ্চলিক স্থানের ‘খাদ্য ‘ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার তাগিদে এই লেখার প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য। সেক্ষেত্রে এই লেখা আঞ্চলিক ইতিহাস পর্যায়ভুক্ত বলা যেতে পারে।
এখনও পর্যন্ত, আঞ্চলিক ইতিহাসের চর্চা ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছে , তাতে গুরুত্ত্বপূর্ণ নতুন চর্চার জায়গা উঠে এলেও, খাদ্য সংস্কৃতিকে আলাদাভাবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কান্দির ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও এর কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি বা বলা যেতে পারে আমি খুঁজে পাইনি । আমার জানা মতে, কান্দি নিয়ে যে গবেষণাধর্মী কাজ হয়েছে তাতে কান্দির সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসই বেশি করে প্রাধান্য পেয়েছে। সুতরাং, কান্দির খাদ্য সংস্কৃতিকে তুলে ধরার তাগিদে, এই লেখার যাত্রা শুরু হল।
বাঙালির জীবনে যেহেতু ‘চা ‘ শুধু মাত্র পান বা স্বাধের তরল নয়, বহু তাত্ত্বিক, অ -তাত্ত্বিক কিংবা অতিতাত্ত্বিক ঝড়ের এবং সম্পর্কের সাক্ষী চা। তাই, এই লেখার প্রথম পর্বে কান্দি শহরের প্রখ্যাত ‘চা’ এর দোকান; পিন্টু দার চায়ের দোকানের কিছু কথা তুলে ধরার চেষ্টা করব।
তবে শুরুতে কান্দির ইতিহাস সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করে নেবো।
কান্দিনামা
দেবদাস রজক এবং কৌশিক বড়ালের সম্পাদনায় সদ্য প্রকাশিত ‘কান্দি: এক প্রাচীন জনপথ’ (২০২৬) বইয়ের কুনালকান্তি সিংহ রায় রচিত দ্বিতীয় অধ্যায় ‘কান্দিতে বৌদ্ধ সংস্কৃতি: একটি অনুসন্ধান’ থেকে জানা যায় মুর্শিদাবাদ জেলার দক্ষিণ পশ্চিম অংশে অবস্থিত কান্দি সর্বাংশে রাঢ় ভূমির অন্তর্গত। ভৌগোলিক দিক থেকে ‘রাঢ়’ বলতে বোঝায়, ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী ভূ-খন্ডকে। রাঢ়ের অপর নাম ছিল সুহ্ম। কোটীবর্ষ ছিল রাঢ়ের রাজধানী। আনুমানিক নবম-দশম শতকে অর্থাৎ পাল-নৃপতিদের শাসনকালে রাঢ় অঞ্চলকে দুইভাগে বিভক্ত করা হয়,যথা -উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ় অংশে। এই দুই অংশের মধ্যবর্তী সীমারেখা ছিল অজয়নদ। অনুমান করা হয় যে, উত্তর- রাঢ়ের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল এইভাবে: বর্তমানে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সাঁওতাল পরগণা সহ সমগ্র বীরভূম জেলা, পূর্ব -বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমা এবং মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমা (পৃষ্ঠা:২৭)।
প্রচলিত ধারণা অনুসারে, “কাঁদা” শব্দ থেকেই কান্দির উৎপত্তি। “কাঁদা ” বলতে বোঝায় নদী তীরবর্তী নিম্ন অঞ্চলকে। এই প্রসঙ্গে কমল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন যে, নদী ও বিলের কাদা জমতো বলে এই অঞ্চলের নাম হয়েছিল কাদি এবং কাদি কথাটা থেকেই কান্দির উৎপত্তি (পৃষ্ঠা:৩৩) ।

কান্দি কোট চত্বর
যেহেতু কান্দির ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্বে ধীরে ধীরে ইতিহাস তুলে ধরবো। এবার পিন্টুদার চায়ের কথায় আসা যাক।
পিন্টু দা’র ‘চা’
কান্দির ফৌজদারী ও দেওয়ানী আদালত চত্বরের দক্ষিণ দিকে পিন্টুদার চায়ের দোকান। কান্দিতে বাইরে থেকে এসেছে কিন্তু পিন্টুদার চায়ের স্বাদ গ্রহণ করেনি, এমন লোকের সংখ্যা সম্ভবত হাতেগোনা। কান্দিবাসী ক্ষেত্রে পিন্টুদার দোকান শুধুমাত্র আড্ডা কিংবা মন পরিবর্তনের আস্তানা নয়, এটি একটি নিশানা।

পিন্টু দার চায়ের দোকানের বর্তমান অবস্থা
২০০০ সালে মুর্শিদাবাদ সহ কান্দি ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়। এই বন্যার পরে বাবিন সাহা ওরফে পিন্টু তার এক বন্ধুর সাথে প্রথম একটি ঢপে (এটি মুর্শিদাবাদের আঞ্চলিক ভাষা এর অর্থ কোনো ভ্যান জাতীয় গাড়ী ) ব্যবসা শুরু করে। এই যাত্রা প্রথমে ‘চা’ দিয়েই শুরু হয়। সেই সময় দোকানের অবস্থা আজকের মতো ছিল না। জায়গাটি নালার (ড্রেন ) মতো ছিল, ধীরে ধীরে উনুনের ছাই দ্বারা জায়গাটি ধীরে ধীরে বাড়ানো হয় এবং জায়গাটি উঁচু হতে থাকে।
তবে ব্যবসা শুরু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে দুই বন্ধুর মধ্যে মতবিরোধ হয়। আনুমানিক, ২০০৫ সাল নাগাদ পুরোনো দোকানের পাশে নিজের ব্যবসা শুরু করেন ববিন সাহা। এইবার তিনি ব্যবসার সঙ্গী হিসেবে বেঁচে নেন নিজের মেজভাই প্রদীপ সাহাকে। পিন্টু সাহা এবং প্রদীপ সাহা চা এবং বিস্কুট সহযোগে পূর্ববর্তী ব্যবসার পুরোনো গতি ধরে রাখতে পারলেও, তার বন্ধুর পক্ষে সেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রথমে চা এবং বিস্কুট দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে তেলেভাঁজা যুক্ত করা হয়। কিছু বছর পর ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ঘটলে পিন্টু সাহার ছোট ভাই মনোজ সাহা দোকানের কাজে যুক্ত হয়।

নীল জামা পরিহিত মনোজ সাহা দোকানের কাজে ব্যস্ত
ধীরে ধীরে খাবারের বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে ফলত কাজের চাপ সামাল দিতে নতুন কর্মচারী নিয়োগ বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে । সেই সময় রান্নার গ্যাসের প্রচলন না থাকায় উনুন সহযোগে সমস্ত রান্না করা হতো। চায়ের সুস্বাদ কান্দি অঞ্চল সহ পাশের অঞ্চল গুলিতেও ছড়িয়ে পরে। দোকানে খরিদ্দারের সমাগম বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। কারণবশত পিন্টু সাহার বাবা স্বর্গীয় নিখিলেশ সাহা এবং সেজো ভাই টুপাই সাহাকেও ব্যবসার কাজে যুক্ত হতে হয়।
শুরুতে দোকানের নামকরণ করা হয়েছিল ‘সাহা টি স্টল’ কিন্তু দোকানটি খ্যাতিলাভ করে পিন্টুর চায়ের দোকান নামেই। বর্তমানে দোকানটিতে ৪ ভাই সহ ৭ জন কর্মচারী কর্মরত। তবে দোকানের অধিকাংশ দায়িত্ব ছোট ভাই মনোজ সাহাকে সামাল দিতে হয়। দোকান প্রত্যেকদিন ভোর ৫ টা থেকে সন্ধ্যে ৬ টা পর্যন্ত সাধারণত খোলা থাকে। এখন খাবারের মেনুতে যুক্ত হয়েছে মিষ্টি, লুচি, কচুরি, পরোটা, রুটি সহ বহুরকমের পদ। তবে চা থেকে শুরু করা ব্যবসায় খাবারের বৈচিত্র্য ঘটলেও এই দোকান কান্দি সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে চায়ের জন্যই পরিচিত।
বর্তমানে কান্দি পুরসভার সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের আওতার দোকানটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু চায়ের স্বাদ আগের মতোই প্রাচীন।
সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
কান্দি রাজ কলেজ, কান্দি
তাপস দাস 



















