চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রেখেছে। এই ঋণ ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত নিলামসূচি ঘোষণা করেছে।
নিলামের বিশদ পরিকল্পনা
ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেবে। এর মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি ৪৪ হাজার কোটি, ১৮২ দিন মেয়াদি ৩৬ হাজার কোটি এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি ৩০ হাজার কোটি টাকার ট্রেজারি বিলের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি সপ্তাহের রোববার এই নিলাম হবে।
সমান সংখ্যক ট্রেজারি বন্ডের নিলামের মাধ্যমে আরও ৩৯ হাজার কোটি টাকার মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দুই বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ১১ হাজার ৫০০ কোটি, তিন বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০ কোটি, পাঁচ ও ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ৯ হাজার ৫০০ কোটি করে ঋণ নেওয়া হবে। এছাড়া ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে মোট ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে সরকার।

ঋণের চাহিদা ও বিশেষ নিলাম
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের ঋণের চাহিদা অনুযায়ী নিলামসূচি তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি নিট ঋণ নয়; পূর্বের নিলামগুলো মেয়াদ শেষ হলে পুনঃনিলামের মাধ্যমে নবায়ন করা হবে। অর্থ সংকট তীব্র হলে সরকার নিলামসূচির বাইরে বিশেষভাবে ব্যাংক ঋণ নিয়েছে। যেমন, গতকাল ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মার্চে ৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকার ট্রেজারি বিল নিলাম হয়েছে, যার সুদহার ছিল ৯.৭৮–১০ শতাংশ। একই সময়ে ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাতের চ্যালেঞ্জ
ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, আগামী তিন মাসে সরকারকে ৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া সহজ হবে না। ব্যাংকে আমানতের বৃদ্ধির বেশিরভাগই সরকারের ঋণে যাচ্ছে। বেসরকারি খাত কয়েক বছর ধরে ঋণবঞ্চিত। উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা নগণ্য। এই পরিস্থিতিতে সরকারের বড় ঋণ বেসরকারি খাতের সংকট আরও বাড়াবে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিসংখ্যান
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য ঠিক করেছিল। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার ইতিমধ্যে ৬২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ৫৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা।
গত বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় চলতি বছরের অভ্যন্তরীণ ঋণ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা ছিল, যা চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে বেড়ে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এক বছরে ঋণ স্থিতি ২৯.৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলছেন, সরকার ঘোষিত ঋণ লক্ষ্য পূরণ কঠিন হতে পারে। তবে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া সম্ভব। সমস্যা হলো সরকারি ঋণ মূলত বেতনভাতা, পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে, যা উৎপাদনশীল নয় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে। তিনি মনে করাচ্ছেন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাই জরুরি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায়। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা হবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















