উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে গুরত্বপূর্ণ রোগীদের জন্য বিছানা সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জীবনরক্ষাকারী সহায়তার অভাবে বিপন্ন রোগীরা প্রতিদিন ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, মার্চ ১ থেকে এপ্রিল ৫ পর্যন্ত ৭৯ জন আইসিইউ ভর্তি রোগীর মধ্যে ২৯ জন মারা গিয়েছেন। এই সংখ্যা হাসপাতালের সংকটপূর্ণ অবস্থা তুলে ধরেছে।
হাসপাতালটি রংপুর বিভাগের আটটি জেলাকে সেবা দেয়, তবুও মাত্র ১০টি আইসিইউ বিছানা রয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। স্ট্রোক, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত রোগীরা ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু অনেকেই অপর্যাপ্ত সহায়তার কারণে বিপদগ্রস্ত।
ডাক্তার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মৃত্যুর হার শুধু বিছানার অভাবে নয়, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাবের কারণে।

নিলফামারীর ডোমার উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম তার critically অসুস্থ স্ত্রী অর্জিনা বেগমের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “২৪ দিনের লড়াইয়ের পর আমরা শেষ পর্যন্ত একটি বিছানা পেয়েছি।”
অন্যান্য রোগীর জন্য আইসিইউ পরিষেবা পাওয়া এখন কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে। এক রোগীর আত্মীয় সোনালি বেগম বলেন, “বিছানা না থাকায় অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করতে পারি।”
জায়নাল আহমেদ জানান, প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউ খরচ অনেক বেশি। “প্রাইভেট হাসপাতালে দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা লাগে। আমরা তা দিতে পারি না, তাই এখানে অপেক্ষা করি। কিন্তু বিছানা খালি হওয়ার আগেই সময় শেষ হয়ে যেতে পারে।”
১,০০০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতাল প্রতিদিন ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন, যা তাদের ক্ষমতার বাইরে। হাসপাতাল সূত্র বলছে, আইসিইউ সেবার চাহিদা প্রতিদিন বেড়ে চলেছে, তবে সীমিত বিছানা ও যন্ত্রপাতি অনেক রোগীকে ভর্তি হতে বাধা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি একটি বিভাগীয় স্তরের সরকারি হাসপাতালের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তারা মনে করছেন, আইসিইউ সম্প্রসারণে শুধু বিছানা বাড়ানো যথেষ্ট নয়, আধুনিক ভেন্টিলেটর, লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স থাকা জরুরি।

আরও একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, দরিদ্র রোগীদের জন্য প্রাইভেট হাসপাতাল প্রায় অসম্ভব, ফলে অনেকেই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. আলফে সানি মৌদুদ আহমেদ বলেন, “আইসিইউর বাইরে কতজন রোগী মারা যাচ্ছে তা আমাদের জানা নেই। দৈনিক ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ রোগীর অন্তত ১০ শতাংশকে আইসিইউ প্রয়োজন। এর অর্থ প্রায় ১০০টি বিছানা দরকার। বর্তমানে মাত্র ১০টি বিছানায় আমরা লড়াই করছি।”
পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ যত্ন দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “উচ্চ কর্তৃপক্ষকে আইসিইউ বিছানা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছি। আশা করি দ্রুত সমাধান হবে।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















