উপসাগরীয় যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় ভারতের রিফাইনারি শিল্প এখন কঠিন চাপে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনৈতিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়া এই খাত এখন উল্টো সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া ভারতীয় তেল আমদানির ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে।
মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কমে বড় ঘাটতি
যুদ্ধের আগে ভারত প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করত, যা ছিল মোট আমদানির প্রায় অর্ধেক। প্রধান সরবরাহকারী ছিল ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে দেশের পশ্চিম উপকূলে তেলের প্রবাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে ভারত আবার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। আগে রাজনৈতিক চাপ ও শুল্ক নীতির কারণে রাশিয়া থেকে আমদানি কমানো হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত প্রায় তিন কোটি ব্যারেল তেল কেনা হয়েছে, যা প্রায় আড়াই সপ্তাহের ঘাটতি পূরণে সহায়ক।

বিকল্প উৎসেও পূর্ণ সমাধান নয়
ভারতের কিছু রিফাইনারি নিম্নমানের ও উচ্চ সালফারযুক্ত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রাখে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা ভেনেজুয়েলা থেকেও তেল আমদানির পথ খুঁজেছে। তবুও মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতির পুরোটা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন প্রায় সাত লাখ ব্যারেলের ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে তেল কোম্পানিগুলো তাদের বাণিজ্যিক মজুদ ব্যবহার শুরু করেছে, যাতে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ সচল রাখা যায়।
লাভ কমছে, বাড়ছে প্রতিযোগিতা
সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি রিফাইনারিগুলোর মুনাফা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে রাশিয়ার তেল কম দামে পাওয়া যেত, এখন তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ ডলার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশও রাশিয়ার তেলের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে প্রতি মাসে শিল্পখাতের আয় বার্ষিক হিসাবে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
সরকারি নীতিও বাড়াচ্ছে চাপ
ভারতের সরকার ২০২২ সাল থেকে অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম স্থির রেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে তা সমন্বয় করা যাচ্ছে না। এতে রিফাইনারিগুলো খুচরা পর্যায়ে আরও চাপে পড়ছে।
এর পাশাপাশি সরকার ডিজেল ও জেট জ্বালানির রপ্তানিতে অতিরিক্ত কর আরোপ করেছে এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কর কমিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ দামে বিক্রির সুযোগ থাকলেও রিফাইনারিগুলো সেই সুবিধা নিতে পারছে না।

আটকে পড়া শিল্প, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ সংকট, বাড়তি ব্যয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু মিলিয়ে ভারতীয় রিফাইনারি শিল্প এক জটিল অবস্থায় আটকে গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















