হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। সোমবার ইরান জানিয়েছে, যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তেহরান কঠোর পাল্টা জবাব দেবে।
এক মাস ধরে চলা সংঘাত এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে। দুই পক্ষের হুমকি-পাল্টা হুমকি এবং নতুন করে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সোমবার গভীর রাতে ইসরায়েলের এক হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের গোয়েন্দা প্রধান মজিদ খাদেমি নিহত হন, যা ইরানের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে আরেকটি বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প বারবার সতর্ক করেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ বা অবরোধ না তুলে নেয়, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে। এই প্রণালী বিশ্বে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। তবে ইরান তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বরং তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে বারবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি সতর্ক করে বলেছেন, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে তাদের পাল্টা অভিযান আরও কঠোর ও বিস্তৃত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্থাপনায় হামলা চালানো হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এতে লাখো সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে রয়েছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে তেলের দাম কিছুটা বাড়লেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনায় অগ্রগতির খবর আসায় পরে তা আবার কমে যায়।
এই অচলাবস্থা ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলোতে স্থল অভিযান চালানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় সংকট নিরসনের চেষ্টা হলেও এখনো কোনো সমাধান আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, বারবার হামলার হুমকি দিয়ে তা বাস্তবায়ন না করলে ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে আটকে পড়া এক মার্কিন বিমানসেনাকে উদ্ধারের পর ট্রাম্প কিছুটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। তিনি রবিবার বলেন, সোমবারের মধ্যেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান সহযোগিতা না করলে তিনি দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর কথাও বিবেচনা করছেন।
একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ট্রাম্প অশালীন ভাষায় ইরানকে দ্রুত হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং ইঙ্গিত দেন, তা না হলে অবকাঠামোতে হামলা শুরু হবে। পরে তিনি মঙ্গলবার রাত ৮টা (ইস্টার্ন সময়) উল্লেখ করে সম্ভাব্য হামলার সময়সীমার ইঙ্গিত দেন।
এদিকে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে এসেছে।
ইরানে গুলি করে ভূপাতিত হওয়ার পর উদ্ধার হওয়া দুই মার্কিন বিমানসেনাকে জার্মানির একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল সোমবার ইরানের একটি বড় পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় বোমা হামলার দাবি করেছে। একই সময়ে ইসরায়েলের হাইফা শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বের প্রভাবশালী তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাসের আট সদস্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি অবকাঠামো ও সরবরাহে যে ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সতর্ক করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি স্থাপনাগুলো পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল ব্যয় লাগবে, ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে।
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১,৬০৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৪৪ জন শিশু। লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতে অন্তত ১,৩৪৫ জন নিহত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের দায়ে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা ২০ জনে পৌঁছেছে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনা সদস্য নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















