মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে তীব্র ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে, যার কারণে প্রায় চার হাজার ট্রাক-পিকআপসহ পণ্যবাহী যানবাহন বন্ধ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় চালক, হেলপারসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় অর্ধলাখ শ্রমিক আকস্মিকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্য আক্রান্ত
উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী অঞ্চল। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ এবং নানা ধরনের শাকসবজি এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়। এছাড়া এই অঞ্চলে মুরগি, গবাদিপশু, মাছ ও বিভিন্ন খামার রয়েছে। অন্যদিকে, সোনামসজিদ ও বাংলাবান্ধার মতো স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে পাথর, ফল, সিমেন্ট ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী আমদানি হয়। এসব পণ্য পরিবহনে যুক্ত ট্রাক-পিকআপের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি, যা অঞ্চলটির শতকোটি টাকার বাণিজ্য সচল রাখে।
ডিজেল সংকট ও শ্রমিকদের দুর্ভোগ
রাজশাহী জেলার ফরিদ উদ্দিন ২২ বছর ধরে ট্রাক চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এমন তেলের ভোগান্তি আগে দেখিনি। তেল না পাওয়ায় হাজার হাজার ড্রাইভার-হেলপার বেকার বসে দিন পার করছেন।’ ট্রাক হেলপার সুমন বিশ্বাসও জানালেন, ‘গাড়ি না চললে আমাদের পেটও চলে না। এক মাস ধরে তেল সংকট চলছে। পাম্প মালিকরা আজ দিলে কাল নেই বলছেন।’
রাজশাহী জেলা ট্রাক-মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সাদরুল ইসলাম বলছেন, ১০ হাজার ট্রাকের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক কমপক্ষে ৭০ হাজার। বন্ধ হয়ে যাওয়া চার হাজার ট্রাকের সঙ্গে আরও পাঁচ-আটজন লোড-আনলোড শ্রমিক যুক্ত থাকায় মোট কর্মহীন শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। এ ছাড়া মাছ, মাংস, শাকসবজি ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে যুক্ত শ্রমিকদের হিসাব মিললে অর্ধলাখের বেশি।

কৃষি উৎপাদন ও বাজারেও প্রভাব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ধান ১ কোটি ৪৫ থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ টন, গম সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টন, আলু ৭৫-৮০ লাখ টন, পেঁয়াজ ১৪-১৬ লাখ টন উৎপাদিত হয়। এছাড়া ২০২৫ সালে গবাদিপশু থেকে সাড়ে তিন লাখ টন দুধ উৎপন্ন হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়েছে, যা দেশের চাহিদা পূরণ করে।
রাজশাহী কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘জ্বালানি ঘাটতির কারণে প্রতিদিন কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে। ট্রাক-লরি সময়মতো না পাওয়ায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরবরাহে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে রয়েছেন। পণ্য পচছে, দাম বেড়ে যাচ্ছে।’

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাকসুদুর রহমান রিংকু বলেন, ‘ডিজেলের অভাবে শুধু ট্রাক নয়, কৃষকের সেচকাজেও সমস্যা হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির প্রধান উৎস নলকূপ, যা তেল ছাড়া চলে না। সরকার তেল সরবরাহ নিশ্চিত না করলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতি হবে।’
প্রশাসন ও সমাধানের আহ্বান
রাজশাহী জেলা পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মনিমুল ইসলাম জানান, সরবরাহ অপ্রতুল। যেখানে দরকার দিনে ১৫ হাজার লিটার, সরকার দিচ্ছে পাঁচ হাজার লিটার। বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ‘আমি বিষয়টি খুঁজে পরে বলতে পারব।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমদ শফিউদ্দিন বলেন, ‘জরুরি পরিবহনের জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ থাকলে জাতীয় জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং অর্থনীতি সচল থাকবে।’
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















