ভোটার তালিকা স্থগিতে রাজ্যের আবেদন নাকচ
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে, যেখানে রাজ্য আরও কিছুদিন সময় চেয়েছিল ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার আগে। সরকারের যুক্তি ছিল, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া প্রায় ২০ লক্ষ ভোটারকে যাচাইয়ের সুযোগ দিলে তারা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারতেন। কিন্তু আদালত সেই অনুরোধ গ্রহণ করেনি।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বহু ভোটার তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এবং এখনও অনেকেই আপিলের সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। তাই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে কিছুটা সময় বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।
আদালতের অবস্থান ও যুক্তি
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, আপিল ট্রাইব্যুনালের শুনানি কোনোভাবেই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জোর করে শেষ করা যাবে না। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি বজায় রাখতে হলে শুনানির যথাযথ সময় দিতে হবে। দ্রুততার জন্য বিচার প্রক্রিয়াকে সংকুচিত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালত আরও উল্লেখ করে, পশ্চিমবঙ্গে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ বিষয়টি একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার কারণে বিচারিক কর্মকর্তাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে।

ভোটারদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক
রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী শ্যাম দিভান যুক্তি দেন, ভোটার তালিকা ৬ এপ্রিল স্থগিত করলে বহু মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। তিনি প্রস্তাব দেন, আপিল ট্রাইব্যুনালগুলোকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হোক এবং ১৮ এপ্রিল একটি পরিপূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হোক।
তিনি আরও বলেন, যেসব ভোটারের আপিল তখনও নিষ্পত্তি হবে না, তাদেরও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এসব ভোটার পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতেও ভোট দিয়েছেন, তাই তাদের হঠাৎ বাদ দেওয়া অন্যায্য।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় ৬০ লক্ষ আপত্তির মধ্যে ৫৯.১৫ লক্ষ ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি প্রক্রিয়াও দ্রুত শেষ করে নির্ধারিত সময়েই ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
কমিশনের আইনজীবী বলেন, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পর একটি সীমারেখা টানা প্রয়োজন। এরপর অসন্তুষ্টরা আপিল করতে পারবেন এবং ট্রাইব্যুনাল নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী শুনানি চালাবে, যা শেষ হতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।

মালদা ঘটনায় কড়া অবস্থান
১ এপ্রিল মালদা জেলায় বিচারিক কর্মকর্তাদের ঘেরাও করার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট কঠোর অবস্থান নেয়। আদালত মন্তব্য করে, এটি কোনো আবেগতাড়িত ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত ও প্ররোচিত একটি কর্মকাণ্ড। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে আদালত জাতীয় তদন্ত সংস্থাকে (এনআইএ) এই ঘটনার তদন্তভার দেয়।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ
একইসঙ্গে আদালত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে। অভিযোগ ওঠে, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বারবার সাহায্যের আহ্বান জানালেও তিনি সাড়া দেননি। পরে মুখ্যসচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শক অনলাইনে উপস্থিত হয়ে আদালতের কাছে ক্ষমা চান।
বিচারপতি বাগচী মন্তব্য করেন, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আরও সহজলভ্য ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, প্রশাসনের একাংশ অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের কারণে এমন আচরণ করছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে স্পষ্ট হয়েছে, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সূচি বদলানো হবে না। একইসঙ্গে আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আপিল প্রক্রিয়ার গুরুত্বও তুলে ধরেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















