রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলাকালে একটি কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি উদ্বেগের কোনো বিষয় নয় এবং কমিশনিং প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই ত্রুটিটি বিবেচনা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
সোমবার নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) কর্মকর্তারা জানান, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে বিভিন্ন নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য ধারাবাহিক পরীক্ষা পরিচালিত হয়। এসব পরীক্ষার সময় ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বর্তমানে সমস্যাটি সমাধানের কাজ চলছে এবং মেরামত শেষে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম আবার শুরু হবে।
এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান বলেন, প্রকল্পে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একাধিক পরীক্ষা পরিচালিত হচ্ছে। তার মতে, পরীক্ষার সময় সামান্য ত্রুটি ধরা পড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতারই প্রতিফলন।
কোন পরীক্ষায় ধরা পড়ে ত্রুটি
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরিচালিত শীতলীকরণ পরীক্ষার সময় সমস্যাটি শনাক্ত হয়। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।
ড. জাহেদুল হাসান জানান, সেকেন্ডারি সার্কিটে ৮ দশমিক ১ মেগাপাস্কাল চাপ প্রয়োগ করে পরিচালিত ‘লিক-টাইটনেস টেস্ট’ একটি বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরীক্ষা। কেন্দ্রকে শাটডাউন অবস্থা থেকে অপারেশনাল পর্যায়ে নেওয়ার আগে নিয়মিতভাবে এই পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা সৈকত আহমেদ বলেন, শনাক্ত হওয়া ত্রুটিটি ছোট এবং দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িক বিরতি দেওয়া হলেও এতে বড় ধরনের কোনো ঝুঁকির ইঙ্গিত নেই।
বিশেষজ্ঞ ও রসাটমের বক্তব্য
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রসাটমের এক প্রতিনিধি বলেন, পরীক্ষামূলক পর্যায়ের মূল উদ্দেশ্যই সম্ভাব্য ত্রুটি খুঁজে বের করে সংশোধন করা। বর্তমান সমস্যাটি বড় নয় এবং মেরামত শেষে পুনরায় পরীক্ষা শুরু করা হবে। এ বিষয়ে আইএইএকেও অবহিত করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলামও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তার মতে, জ্বালানি লোডিং ও কমিশনিং পর্যায়ে ক্ষুদ্র কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়া স্বাভাবিক ঘটনা। কোনো বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিলে প্ল্যান্ট সম্পূর্ণভাবে শাটডাউন করতে হয়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সে ধরনের নয়।
প্রকল্পের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এর আগেও জ্বালানি লোডিংয়ের আগে রিঅ্যাক্টর কুলিং পাম্পে একটি ত্রুটি ধরা পড়েছিল। সে সময় কয়েক দিনের জন্য কার্যক্রম বন্ধ রেখে সমস্যা সমাধান করা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, রূপপুর প্রকল্পে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রকল্পটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে নির্মিত হয়েছে। প্রথম প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আরও দুটি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্প সূত্র অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে গত ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে দুটি ইউনিট থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















