মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়নি, কিন্তু এর অর্থনৈতিক অভিঘাত ইতোমধ্যেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা থাকলেও বাজার, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত দূর হওয়ার লক্ষণ নেই। বরং এই সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এমন এক যুগে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা আবারও রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত পরিকল্পনার কেন্দ্রে চলে আসছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই সংঘাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য কে দিচ্ছে? উত্তরটি মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া।
এশিয়ার ওপর সবচেয়ে বড় চাপ
বিশ্বের বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক অর্থনীতিগুলোর বেশিরভাগই এশিয়ায় অবস্থিত। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ তাদের শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানিকৃত তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়, বাণিজ্য ঘাটতি গভীর হয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ভারতের মতো দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির জন্য এটি একটি কঠিন সমীকরণ। একদিকে রয়েছে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার ও জনসংখ্যাগত সুবিধা, অন্যদিকে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানি। তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার বা তার বেশি থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
চীনের ঝুঁকি ও সুযোগ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনও এই সংকটের বাইরে নয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বেইজিংও চাপ অনুভব করবে।
তবে গত এক দশকে চীন এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা, বিশাল কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে দেশটি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
এই সংকট চীনের দীর্ঘদিনের একটি যুক্তিকেই আরও জোরালো করছে: পশ্চিমা শক্তিনিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক রুট ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি কৌশলগত দুর্বলতা। ফলে বহু উন্নয়নশীল দেশ বিকল্প অর্থনৈতিক অংশীদার ও নতুন অবকাঠামোগত সংযোগের দিকে ঝুঁকতে পারে, যেখানে চীনের প্রভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ইউরোপের অস্বস্তিকর বাস্তবতা
ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ যে জ্বালানি সংকটে পড়েছিল, তার ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। নতুন মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই ক্ষতের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে জার্মানির মতো শিল্পনির্ভর অর্থনীতি আবারও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের মুখোমুখি। উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমছে এবং সরকারগুলোর আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত। ফলে ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের তুলনায় আরও দুর্বল হতে পারে।
যে মহাদেশ একসময় বৈশ্বিক শিল্পশক্তির প্রতীক ছিল, সেখানে এখন স্থবিরতার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রও পুরোপুরি নিরাপদ নয়
অনেকের ধারণা হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের কারণে এই সংকট থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
দেশটির শক্তিশালী জ্বালানি খাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে। কিন্তু একই সঙ্গে উচ্চ জ্বালানি মূল্য পরিবহন, পেট্রোকেমিক্যাল ও উৎপাদন খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফল হিসেবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও তা প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল হতে পারে, আর মুদ্রাস্ফীতির চাপ নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
আফ্রিকার জন্য জ্বালানি সংকট মানেই খাদ্য সংকট
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বহুবার সতর্ক করেছে যে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে কঠিন আঘাত পড়ে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর।
আফ্রিকার বহু দেশে জ্বালানির দাম বাড়া মানে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্যের দাম বৃদ্ধি। ফলে অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত সামাজিক সংকটে পরিণত হয়। মিসর, কেনিয়া কিংবা সেনেগালের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যেই বৈদেশিক অর্থায়নের চাপে রয়েছে। নতুন জ্বালানি ধাক্কা তাদের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
যুদ্ধের প্রকৃত উত্তরাধিকার
মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো স্বল্পমেয়াদে উচ্চমূল্যের সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত রপ্তানিকারকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিনিয়োগ কমে যায়, পরিবহন ব্যাহত হয় এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়।
এই কারণেই বর্তমান সংকটকে শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক পরিবর্তনের সূচনা, যেখানে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ব্যবধান দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি বা নতুন কোনো চুক্তি ভবিষ্যতের উত্তেজনা কমাতে পারে। কিন্তু ইতোমধ্যে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে মুছে যাবে না। বিশ্বের অর্থনীতি এখন এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে সস্তা, নিরাপদ এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ আর নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাবে না।
এবং সেই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে বড় মূল্য সম্ভবত দিচ্ছে—এশিয়া।
ড্যান স্টেইনবক 



















